জীবন

নীরবতা

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার
একা থাকা শিল্প — ফোন ছাড়া শান্তিপূর্ণ সকালে চা আর ধ্যানের মুহূর্ত
“একা থাকা মানে শুধু ফোন হারানো নয়। এটা নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প।”

রবিবার সকাল। হ্যাপি আর আরাশ বেরিয়ে গেল নানুর বাড়ি। দুদিনের জন্য।

আমি যাইনি। কাজ আছে বলেছি।

মিথ্যা কথা। কাজ নেই।

কিন্তু যাইনি। কেন যাইনি জানি না।

এখন পুরো বাড়ি খালি। আমি একা।

সোফায় বসে আছি। কী করব জানি না।

সাধারণত এই সময়ে হাতে থাকে কিছু না কিছু। খবরের কাগজ। বই। চিঠি। কিছু।

আজ কিছু নেই। হাত খালি।

অস্বস্তিকর লাগছে।

উঠে রান্নাঘরে গেলাম। চা বানাব ভেবে।

গ্যাসে দিলাম চুলা। দাঁড়িয়ে রইলাম।

সাধারণত এই সময়ে কিছু না কিছু করি। কাগজ পড়ি। জানালা দিয়ে রাস্তা দেখি। কিছু।

আজ শুধু দাঁড়িয়ে আছি।

পানি ফুটছে। শব্দ হচ্ছে। চায়ের পাতা দিলাম। গন্ধ বেরোচ্ছে।

অদ্ভুত লাগছে। এই গন্ধটা আগেও ছিল। কিন্তু কখনো খেয়াল করিনি।

চা নিয়ে বারান্দায় এলাম। চেয়ারে বসলাম। চুমুক দিলাম।

এই চায়ের স্বাদ কেমন?

জানি না। কত বছর ধরে চা খাচ্ছি। কিন্তু কখনো শুধু চা খাইনি। খাওয়ার সময় হয় কারো সাথে কথা বলছি, না হয় কিছু পড়ছি।

আজ শুধু চা। আর আমি।

স্বাদটা মন্দ না।

বারান্দা থেকে রাস্তা দেখা যায়। একটা কাক কিছু একটা খুঁটছে। মন দিয়ে খুঁটছে।

কাকটার কোনো চিন্তা নেই। কোনো পরিকল্পনা নেই। শুধু খুঁটছে।

আমার কখন এরকম ছিল শেষবার? কোনো চিন্তা না করে শুধু একটা কাজ করা?

মনে পড়ছে না।

দুপুর হলো।

পেট খিদে পেয়েছে। খেতে হবে।

রান্না করতে হবে।

কতদিন রান্না করিনি? মাস তিনেক হবে।

রান্নাঘরে গিয়ে দেখি কী আছে। ডিম আছে। পেঁয়াজ আছে।

ডিম ভাজি বানালাম। আলু ভাজি বানালাম। গরম ভাত।

খেতে বসলাম। একা।

সাধারণত খাওয়ার সময় হ্যাপি থাকে। আরাশ থাকে। কথা হয়। হাসি হয়।

আজ কেউ নেই। শুধু আমি। শুধু খাবার।

অদ্ভুত শান্তি লাগছে।

বিকেল।

ছাদে উঠলাম। শুয়ে পড়লাম। মাথার নিচে হাত দিয়ে।

আকাশে মেঘ।

কতদিন আকাশ দেখিনি?

মাথার উপরে তো সবসময়ই আকাশ। কিন্তু দেখি না। কারণ তাকাই না।

আজ তাকালাম।

নীল। সাদা মেঘ। ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে।

সুন্দর।

সন্ধে।

ছাদ থেকে নামলাম। বাড়ি এখনো খালি।

আজ সারাদিন কারো সাথে কথা হয়নি। কোনো আওয়াজ হয়নি।

নীরবতা।

ভয় পাচ্ছি না। অবাক লাগছে।

সাধারণত নীরবতা সহ্য হয় না। কিছু না কিছু চাই। কথা। আওয়াজ। কিছু।

আজ নীরবতা ভালো লাগছে।

রাত নটা।

দরজায় ঘণ্টি বাজল। হ্যাপির ফোন।

“কী করছ?”

“কিছু না। বসে আছি।”

“একা একা?”

“হ্যাঁ।”

“বিরক্ত লাগছে না?”

“না। একদম না।”

কথা শেষে ফোন রেখে দিলাম। আবার নীরবতা।

কিন্তু এবারের নীরবতা আগের চেয়ে গভীর। কারণ এবার জানি যে কেউ আছে। দূরে। কিন্তু আছে।

এই জানাটাই যথেষ্ট।

রাত এগারোটা।

বিছানায় শুয়ে আছি। ঘুম আসছে। আস্তে আস্তে।

স্বাভাবিক ঘুম।

শুধু নীরবতা। আর শ্বাসের শব্দ।

সোমবার সকাল।

চোখ খুলল নিজে থেকে।

হ্যাপি আর আরাশ ফিরবে বিকেলে।

উঠে বারান্দায় গেলাম। দাঁড়িয়ে রইলাম।

রাস্তায় মানুষ হাঁটছে। গাড়ি যাচ্ছে। দোকান খুলছে।

সবাই ব্যস্ত। কোথাও যাচ্ছে। কিছু করছে।

আমি শুধু দাঁড়িয়ে আছি। কিছু করছি না।

কিন্তু খারাপ লাগছে না।

চা বানাতে গেলাম। ধীরে ধীরে।

চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।

আমি একা ছিলাম দুদিন। কিন্তু একাকী ছিলাম না।

দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।

একা থাকা মানে কেউ নেই।

একাকী থাকা মানে সবাই আছে কিন্তু আসলে কেউ নেই।

বিকেল চারটায় দরজা খুলল। হ্যাপি আর আরাশ ঢুকল।

“কেমন ছিল?” হ্যাপি জিজ্ঞেস করল।

“ভালো।”

“কী করেছ?”

“কিছু না। শুধু ছিলাম।”

হ্যাপি একটু অবাক হয়ে তাকাল। তারপর হাসল।

আরাশ দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল। “বাবা, তোমাকে মিস করেছি।”

আমি ছেলেকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, “আমিও।”

সত্যি কথা বলেছি।

কিন্তু একটা কথা বলিনি।

এই দুদিনে নিজেকেও মিস করেছি। যে নিজেকে ভুলে গিয়েছিলাম অনেকদিন আগে।

রাতে খাওয়ার পর তিনজন বসে গল্প করছি। হ্যাপি বলছে নানুর বাড়ির কথা। আরাশ বলছে খেলার কথা।

আমি শুনছি। শুধু শুনছি। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছি। হাসছি।

কিন্তু মনটা অন্য জায়গায়।

মনটা আছে সেই নীরবতায়। সেই চায়ের গন্ধে। সেই আকাশে।

হ্যাপি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি ঠিক আছো?”

“হ্যাঁ। একদম ঠিক।”

“তোমাকে অন্যরকম লাগছে।”

“অন্যরকম কীভাবে?”

“জানি না। শান্ত মনে হচ্ছে।”

আমি কিছু বললাম না। হ্যাপি হয়তো ঠিক বলছে।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে জানালা খুলে রাখলাম। হাওয়া এল।

দুদিন নীরবতায় ছিলাম। এখন আবার আওয়াজ ফিরে এসেছে। গল্প। হাসি। জীবন।

কিন্তু সেই নীরবতা চলে যায়নি। আছে। ভেতরে কোথাও।

যখন দরকার হবে, খুঁজে নেব।

হয়তো সেটাই শিখেছি। নীরবতা হারিয়ে যায় না। লুকিয়ে থাকে। আমাদের ভেতরে।

শুধু খুঁজতে জানতে হয়।

অস্তিত্ব একাকিত্ব নস্টালজিয়া নীরবতা পরিচয়

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

সংখ্যা

ডিসেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া

জীবন

দূরত্ব

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া

কথা

মুখোশ

অক্টোবর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *