টিউব লাইটের সাদা আলোয় প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছি। সামনে থালায় ভাত, ডাল, আলু ভর্তা। ক্যান্টিনের খাবার সব একই স্বাদ—যেন কোনো মা বানায়নি, যন্ত্র বানিয়েছে। চারপাশে সহকর্মীরা দল বেঁধে বসে গল্প করছে। হাসি, কথা, চামচের আওয়াজ। আমি একা।
এই ‘একা’ শব্দটা কী অদ্ভুত। একা মানে তো শুধু একজন থাকা নয়। একা মানে চারপাশে শত মানুষ থাকলেও নিজেকে অদৃশ্য মনে হওয়া। আমি খাই, কিন্তু মনে হয় খাবারের স্বাদ আমার মুখে পৌঁছায় না। শুধু পেট ভরে, মন ভরে না।
পাশের টেবিলে রহিম সাহেব বলছেন, “আরে শোনো, গতকাল বাসায় কী রান্না হয়েছিল!” অন্যরা শুনছে, মন দিয়ে। আমি ভাবি, আমার যদি বলার মতো কেউ থাকত—হ্যাপি সকালে পরোটা বানিয়েছে, আরাশ নতুন একটা শব্দ শিখেছে। কিন্তু এখানে কে শুনবে আমার গল্প?
ডালটা খেতে খেতে মনে পড়ে হ্যাপির রান্নার কথা। তার হাতের ডালে থাকে জিরার গন্ধ, পেঁয়াজের মিষ্টি স্বাদ। এখানে শুধু লবণ আর হলুদ। কোনো ভালোবাসা নেই।
মানুষ কেন দল বাঁধে? কেন একসাথে খায়? এতে কি খাবারের স্বাদ বাড়ে? নাকি একাকীত্বের স্বাদ কমে? আমি আগে চেষ্টা করেছি তাদের সাথে মিশতে। কিন্তু তারা যে ভাষায় কথা বলে, আমি সেই ভাষা জানি না। তারা হাসে সিনেমার কথা বলে, আমি ভাবি জীবনের কথা।
একবার শাহিন এসে বসেছিল আমার পাশে। বলেছিল, “ভাই, কেমন আছেন?” আমি বলতে গিয়েছিলাম, “আসলে ভালো থাকা মানে কী?” সে আর কথা বাড়ায়নি। পরদিন থেকে অন্য টেবিলে বসে।
আমি কি অন্য রকম? নাকি অন্যরা অন্য রকম? কে স্বাভাবিক, কে অস্বাভাবিক? এই প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরতে থাকে। খাবার শেষ করে যখন উঠি, মনে হয় আমি শুধু খাবার খাইনি, একাকীত্বও খেয়েছি।
বাড়ি ফিরে যখন হ্যাপি জিজ্ঞেস করে, “অফিসে কেমন ছিল আজ?” আমি বলি, “ভালো।” কিন্তু বলি না যে দুপুরে ত্রিশ মিনিট ধরে কারো সাথে একটা কথাও বলিনি। বলি না যে ক্যান্টিনের আলোতে নিজেকে একটা ছায়া মনে হয়েছে।
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, এই একাকীত্ব যেন আমাকে আরো খারাপ না করে। বরং যেন বুঝতে পারি, সত্যিকারের সঙ্গ কী। হয়তো একা থাকাটাই আমার জন্য ঠিক। হয়তো এই নীরবতার ভিতরেই আমি নিজেকে খুঁজে পাব।
ক্যান্টিনের প্লাস্টিকের চেয়ার আমাকে শেখায়—কখনো কখনো একা খাওয়াই ভালো। কারণ তখন খাবারের সাথে সাথে নিজের সাথেও পরিচিত হওয়া যায়।
একটু ভাবনা রেখে যান