মাগরিবের নামাজ শেষ। সবাই চলে গেছে। মসজিদে শুধু আমি একা বসে আছি। শুধু আমি আর আল্লাহ।
এই নিস্তব্ধতা অন্য রকম। ঘরের নিস্তব্ধতা নয়। এখানে একটা পবিত্রতা আছে। একটা শান্তি আছে। মনে হয় আল্লাহ আমার খুব কাছে।
মিহরাবের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে মনে কথা বলি, “হে আল্লাহ, আমি এসেছি আপনার কাছে। আমার মন ভারী। আমার অনেক কথা।”
কেউ শুনতে পায় না। শুধু তিনি শুনেন।
“আমি জানি না আমি ঠিক পথে আছি কিনা। অফিসে যে কাজ করি, সেটা কি আপনার পছন্দ? আমি যেভাবে বাঁচি, সেটা কি আপনার মনঃপূত হয়?”
নিস্তব্ধতা। কোনো উত্তর আসে না। কিন্তু মনে হয় তিনি শুনছেন।
“হে আল্লাহ, আমার বাবা যখন মারা যান, আমি খুব কেঁদেছিলাম। ভেবেছিলাম আপনি আমার সাথে অন্যায় করেছেন। এখন বুঝি, সেটা আমার ভুল ছিল। আপনি কখনো অন্যায় করেন না।”
চোখে পানি আসে। এই মসজিদে কাঁদতে লজ্জা নেই।
“আমার মা যখন অসুস্থ ছিলেন, আমি আপনার কাছে অনেক দোয়া করেছি। বলেছি, ‘তাকে সুস্থ করুন।’ কিন্তু আপনি তাকে নিয়ে গেছেন। প্রথমে মন খারাপ হয়েছিল। এখন বুঝি, হয়তো এটাই তার জন্য ভালো ছিল।”
মসজিদের দেয়ালে আল্লাহর নামগুলো লেখা। আর-রহমান, আর-রহিম, আর-গফুর। দয়ালু, করুণাময়, ক্ষমাশীল। এই নামগুলো দেখে শান্তি লাগে।
“হে আল্লাহ, আমি অনেক ভুল করেছি। মিথ্যা বলেছি, মানুষকে ঠকিয়েছি, আপনার আদেশ অমান্য করেছি। কিন্তু আপনি তো ক্ষমাশীল। আমাকে ক্ষমা করুন।”
এখানে মিথ্যা বলার দরকার নেই। তিনি সব জানেন।
“আরাশের কথা ভাবি। সে বড় হচ্ছে। আমি তাকে কি সঠিক পথ দেখাতে পারছি? আমি নিজেই তো পথ খুঁজে পাই না অনেক সময়।”
মনে পড়ে আরাশের নিষ্পাপ মুখ। তার প্রশ্নগুলো। “বাবা, আল্লাহ কেমন?” আমি কী উত্তর দিয়েছিলাম? ঠিক দিয়েছিলাম?
“হে আল্লাহ, হ্যাপির কথা বলি। সে খুব ভালো। আমার চেয়ে অনেক ভালো। সে কখনো অভিযোগ করে না। আমার সব ভুল সহ্য করে। তার জন্য আপনার কাছে দোয়া করি।”
হ্যাপির মুখ ভাসে মনে। তার ধৈর্য, তার ভালোবাসা। আমি কি তার প্রাপ্য দিতে পারি?
“আমার চাকরি নিয়ে চিন্তা। কখনো মনে হয় ছেড়ে দিই। কিন্তু তারপর সংসার চলবে কিভাবে? আপনি কি আমাকে পথ দেখাবেন?”
এই প্রশ্নের উত্তর কোথায়? সরাসরি কোনো আওযাজ আসে না। কিন্তু মনে একটা শান্তি নামে।
“হে আল্লাহ, আমি জানি আপনি আমার সব দোয়া রাখেন না। কিন্তু যেটা আমার জন্য ভালো, সেটা দেন। আমি বুঝি না কোনটা ভালো। আপনি জানেন।”
মাঝে মাঝে মনে হয় তিনি আমার সাথে কথা বলছেন। কোনো আওয়াজ নয়, কিন্তু মনের ভিতর একটা প্রশান্তি।
“আমার বন্ধুরা বলে, ‘দোয়া করে লাভ কী? কিছুই তো হয় না।’ কিন্তু আমি জানি, দোয়া করলে মন ভালো হয়। আপনার সাথে কথা বলতে পারি।”
এই কথোপকথন অন্য রকম। মানুষের সাথে কথা বললে উত্তর চাই। কিন্তু আল্লাহর সাথে কথা বললে শুধু বলাটাই যথেষ্ট।
“যখন খুব কষ্ট পাই, তখন আপনার কথা মনে হয়। মনে হয় আপনি আছেন। দেখছেন। এই ভাবনা শক্তি দেয়।”
এশার আজান হয়। মানুষ আসতে শুরু করেছে। আমার একান্ত সময় শেষ।
উঠে দাঁড়াই। তবে যাওয়ার আগে শেষবার বলি, “হে আল্লাহ, এই কথোপকথন আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি আবার আসব। আপনি তো সবসময়ই আছেন।”
মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় মনে হয় আমি হালকা হয়ে গেছি। যে ভার নিয়ে এসেছিলাম, সেটা এখানেই রেখে যাচ্ছি।
এই নিস্তব্ধ কথোপকথন আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন।
একটু ভাবনা রেখে যান