দীর্ঘায়ু: আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ
শফিকুল ইসলাম — পঁচানব্বই বছর
সকালে তার বারান্দায় গেলাম। শফিকুল সাহেব রোদে বসে আছেন — একটা পুরনো কাঠের চেয়ারে, যে চেয়ারটায় তিনি গত ত্রিশ বছর ধরে বসেন। চোখে সানগ্লাস, হাতে আজকের পত্রিকা, পাশের টেবিলে অর্ধেক খাওয়া চায়ের কাপ। তাকে দেখলে বোঝার উপায় নেই এই মানুষটা প্রায় এক শতাব্দী পার করে এসেছেন। পিঠ টানটান, চোখে এখনো উজ্জ্বলতা, কণ্ঠে স্পষ্টতা।
“কেমন আছেন, চাচা?”
তিনি পত্রিকা নামিয়ে রাখলেন। মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল — সেই হাসি যা হাসে তারা যারা জীবনের সাথে শান্তি করে ফেলেছে। “আলহামদুলিল্লাহ, বাবা। দেখো, আজ সকালে খবর পেলাম — আমার প্রপৌত্রের জন্ম হয়েছে। ঢাকায়, মেয়ের নাতির ঘরে। চতুর্থ প্রজন্ম দেখতে পেলাম এই চোখে।” তার গলায় কাঁপুনি নেই, আছে অপার আনন্দ, অপার কৃতজ্ঞতা।
আমি পাশের চেয়ারে বসলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “এত দীর্ঘ জীবন কেমন লাগে? পঁচানব্বই বছর — প্রায় এক শতাব্দী।”
শফিকুল সাহেব চোখ বন্ধ করলেন। যেন স্মৃতির পাতা উল্টাচ্ছেন। তারপর বললেন, “আমি দেখেছি দেশের জন্ম, বাবা। একাত্তরে রাইফেল হাতে যুদ্ধ করেছি, মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। দেখেছি স্বাধীনতার সূর্যোদয় — সেই ১৬ই ডিসেম্বরের সকাল এখনো চোখে ভাসে। তারপর দেখেছি দুর্ভিক্ষ, দেখেছি সামরিক শাসন, দেখেছি গণতন্ত্র ফিরে আসা। দেখেছি আমার ছেলে বিয়ে করতে, নাতি-নাতনিদের স্কুলে যেতে, তাদের বিয়ে হতে। এখন দেখছি প্রপৌত্র — আমার রক্ত, চার প্রজন্ম পরে।” তিনি চোখ খুললেন, আমার দিকে তাকালেন। “এটা আশীর্বাদ নয় তো কী? প্রতিদিন সকালে যখন চোখ খুলি, একটা নতুন সূর্যোদয় দেখি। প্রতিদিন বিকেলে যখন নাতিরা আসে, একটা নতুন গল্প শুনি। আল্লাহ আমাকে অনেক দিয়েছেন।”
আবদুল হাকিম — আটানব্বই বছর
হাসপাতালের তিনতলায় কেবিন নম্বর সাত। দরজা ঠেলে ঢুকলাম। আবদুল হাকিম সাহেব শুয়ে আছেন বিছানায় — চোখ বন্ধ, শরীর শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেছে, হাতে স্যালাইনের সুই। ঘরে কেউ নেই। টিভি বন্ধ। জানালার পর্দা টানা। একটা গা-শিরশির করা একাকীত্ব ঘরময় ছড়িয়ে আছে।
“কেমন আছেন, চাচা?”
চোখ খুললেন। আমাকে দেখে চিনতে একটু সময় লাগল। তারপর বললেন, ক্ষীণ গলায়, “মরতে পারছি না, বাবা।”
আমি চমকে উঠলাম। “কী বলছেন?”
“সবাই চলে গেছে।” তার চোখে জল জমতে শুরু করল। “আমার স্ত্রী — তিরিশ বছর আগে ক্যান্সারে। আমার বন্ধুরা — একে একে সবাই, কেউ হার্ট, কেউ স্ট্রোক, কেউ বুড়ো হয়ে। আমার একমাত্র ছেলেও গত বছর হার্ট অ্যাটাকে, ষাট বছর বয়সে। নিজের ছেলেকে কবর দিতে হলো এই হাতে।” তার শুকনো হাতটা কাঁপছিল। “আমি একা পড়ে আছি। শরীর আর চলে না — হাঁটতে পারি না, দাঁড়াতে পারি না। চোখেও ঠিকমতো দেখি না। মাথাও ঠিক নেই — কিছু মনে থাকে না, সকালে কী খেয়েছি বিকেলে ভুলে যাই। কিন্তু মরতে পারি না। এ কেমন শাস্তি, বাবা!”
আমি চুপ করে রইলাম। কী বলব বুঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, “নাতি-নাতনিরা?”
“তারা তাদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। ঢাকায় থাকে, চাকরি করে। মাসে একবার আসে, দশ মিনিট থাকে, চলে যায়। আমি তাদের কাছে একটা বোঝা — একটা দায়িত্ব যা পালন করতে হয়, কিন্তু ভালোবাসা নেই।” তার কণ্ঠ ভেঙে গেল। “আমি শুধু চাই এই কষ্ট শেষ হোক।”
আমার ভাবনা
হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাঁটছিলাম। দুই বৃদ্ধের কথা মাথায় ঘুরছিল — দুজনেই প্রায় একই বয়সী, দুজনেই প্রায় এক শতাব্দী বেঁচেছেন। কিন্তু একজনের কাছে এই জীবন আশীর্বাদ, আরেকজনের কাছে অভিশাপ। তাহলে দীর্ঘায়ু আসলে কী? শুধু সংখ্যা? শুধু বছরের হিসাব?
শফিকুল সাহেবের জীবন আশীর্বাদ — কারণ তিনি সুস্থ, হাঁটতে পারেন, দেখতে পারেন, স্মৃতি অক্ষত। তার চারপাশে পরিবার আছে — ছেলে, নাতি, প্রপৌত্র — প্রতিদিন কেউ না কেউ আসে, খোঁজ নেয়, গল্প করে। তার মানসিক শান্তি আছে — জীবনের সাথে তিনি তৃপ্ত, যা পেয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট।
আবদুল হাকিম সাহেবের জীবন অভিশাপ — কারণ তিনি অসুস্থ, শরীর অচল, স্মৃতি ক্ষয়ে যাচ্ছে। তিনি একা — স্ত্রী নেই, বন্ধু নেই, এমনকি ছেলেও নেই। মানসিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েছেন — বেঁচে থাকাটাই এখন তার কাছে শাস্তি।
তাহলে দীর্ঘায়ুর মূল্য নির্ভর করে কীসের ওপর? শুধু বছরের সংখ্যা নয় — সেই বছরগুলোর মান। শুধু বেঁচে থাকা নয় — কীভাবে বেঁচে থাকা।
আমার ভবিষ্যৎ
আমার বয়স এখন সাঁইত্রিশ। যদি আমি নব্বই বছর বাঁচি? তখন আরাশের বয়স হবে চৌষট্টি — সে নিজেই তখন বুড়ো হয়ে যাবে। তার সন্তানরা — আমার নাতি-নাতনি — হয়তো তখন মধ্যবয়সী, তাদের সন্তান হয়ে গেছে। আমি প্রপিতামহ হব, শফিকুল সাহেবের মতো চার প্রজন্ম দেখব। কিন্তু হ্যাপি থাকবে তো? সে কি আমার আগে চলে যাবে? আমার বন্ধুরা — জামিউ, মৃদুল, সাইফুল — তারা কি থাকবে? নাকি আমি আবদুল হাকিম সাহেবের মতো একা পড়ে থাকব হাসপাতালের বিছানায়, অপেক্ষায় থাকব কখন এই যন্ত্রণা শেষ হবে?
স্বাস্থ্যের প্রশ্ন
দীর্ঘায়ু মানে শুধু বেশি দিন বাঁচা নয়। মানে কেমনভাবে বাঁচা। যদি নব্বই বছর বয়সেও আমি সকালে উঠে একটু হাঁটতে পারি, চোখে পত্রিকা পড়তে পারি, কানে আরাশের গল্প শুনতে পারি — তাহলে সেই নব্বই বছর আশীর্বাদ। কিন্তু যদি শেষ বিশ বছর কাটে বিছানায় পড়ে, ডায়াপার পরে, অন্যের ওপর নির্ভর করে প্রতিটি কাজের জন্য — তাহলে সেই নব্বই বছর অভিশাপ। কে নিয়ন্ত্রণ করে এটা? কিছুটা জিন, কিছুটা ভাগ্য, কিছুটা নিজের হাতে — খাওয়া-দাওয়া, ব্যায়াম, মানসিক স্বাস্থ্য।
টাকার প্রশ্ন
শফিকুল সাহেবের সরকারি পেনশন আছে — মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাড়তি ভাতা আছে। নিজের বাড়ি আছে, জমিজমা আছে। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত, তারা নিজেরাই চলতে পারে, বাবার ওপর নির্ভরশীল নয়। আবদুল হাকিম সাহেবের সেরকম কোনো সঞ্চয় নেই। সারাজীবন দিন আনি দিন খাই করেছেন, বুড়ো বয়সের জন্য কিছু রাখতে পারেননি। এখন হাসপাতালের বিল চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। দীর্ঘায়ু কি তাহলে ধনীদের আশীর্বাদ আর গরিবদের অভিশাপ? টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না বলে যে প্রবাদ — সেটা কি পুরোপুরি সত্য?
একাকীত্বের প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে হয় একাকীত্ব। যারা খুব বেশি দিন বাঁচে, তাদের প্রিয়জনরা একে একে চলে যায়। স্বামী বা স্ত্রী যায় আগে। বন্ধুরা যায়। এমনকি নিজের সন্তানও চলে যেতে পারে — আবদুল হাকিম সাহেবের মতো। নিজের ছেলেকে কবর দেওয়া — এর চেয়ে কঠিন কী আছে পৃথিবীতে? প্রকৃতির নিয়ম হলো বাবা-মা আগে যাবে, সন্তান পরে। কিন্তু যখন সেই নিয়ম উল্টে যায়, তখন যে যন্ত্রণা — সেটা বর্ণনার অতীত।
আমার সিদ্ধান্ত
আমি চাই দীর্ঘ জীবন। কে না চায়? কিন্তু শর্তসহ। যতক্ষণ সুস্থ থাকব — হাঁটতে পারব, দেখতে পারব, ভাবতে পারব। যতক্ষণ প্রিয়জনরা থাকবে — হ্যাপি থাকবে, আরাশ থাকবে, একটু বন্ধু-বান্ধব থাকবে। যতক্ষণ অর্থকষ্ট না হবে — চিকিৎসার খরচ চালাতে পারব, অন্যের কাছে হাত পাততে হবে না। যতক্ষণ অন্যের বোঝা না হব — নিজের কাজ নিজে করতে পারব, সন্তানের ঘাড়ে চাপতে হবে না। এই শর্তগুলো পূরণ হলে একশো বছর বাঁচতেও রাজি। না হলে? না হলে কম বাঁচাই ভালো।
শেষ কথা
শফিকুল সাহেব আমাকে দেখিয়েছেন দীর্ঘায়ুর সুন্দর মুখ — রোদে বসে পত্রিকা পড়া, প্রপৌত্রের জন্মের খবরে আনন্দিত হওয়া, জীবনের সাথে তৃপ্ত থাকা। আবদুল হাকিম সাহেব দেখিয়েছেন অন্ধকার মুখ — হাসপাতালের বিছানায় একা শুয়ে থাকা, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা, বেঁচে থাকাকে শাস্তি মনে করা। আমি কোন পথে যাব — শফিকুল সাহেবের নাকি আবদুল হাকিম সাহেবের — সেটা হয়তো পুরোপুরি আমার হাতে নেই। জীবন, ভাগ্য, সময় — এরা নিজেদের মতো চলে। কিন্তু চেষ্টা করতে পারি। সুস্থ থাকার চেষ্টা করব — খাওয়া-দাওয়ায় সংযম, নিয়মিত হাঁটা, মানসিক চাপ কমানো। পরিবারের যত্ন নেব — হ্যাপির সাথে সময় কাটাব, আরাশের সাথে বন্ধুত্ব রাখব। বন্ধুত্ব বজায় রাখব — পুরনো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখব, নতুন বন্ধু তৈরি করব। সঞ্চয় করব — বুড়ো বয়সের জন্য, অসুস্থতার জন্য, যেন কারো কাছে হাত পাততে না হয়। তারপরও যদি আবদুল হাকিম সাহেবের মতো অবস্থা হয়? তাহলে মেনে নেব। এটাও জীবনের অংশ। কারণ দীর্ঘায়ু আশীর্বাদ না অভিশাপ — সেটা শুধু পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে আমরা কীভাবে নিই।
একটু ভাবনা রেখে যান