ব্লগ

নিজের কাছে একটি চিঠি

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

প্রিয় হায়দার,

আজ রাত ২টা বেজে গেছে। আবারও ঘুম আসছে না। তাই তোমাকে একটা চিঠি লিখছি। নিজেকে লেখা প্রথম চিঠি।

আজ সকালে আম্মু ফোন করেছিল। “হায়দার, তোর ভাই engineer হইছে। তোর ছোট বোন teacher হইছে। আর তুই? ঘণ্টায় ঘণ্টায় চাকরি ছাড়িস। আমার মাথা কী জবাব দেব?”

আমি কী বলব আম্মুকে? বলব যে আমি engineer হতে চাইনি কখনো? বলব যে আমি ছোটবেলা থেকে লেখালেখি করতে চেয়েছি? বলব যে আমি একটা ছোট্ট পত্রিকা অফিসে কাজ করতে চেয়েছিলাম?

না, এসব আমি বলতে পারি না। কারণ আম্মুর যুক্তি সহজ – “লেখালেখি দিয়া সংসার চলে?”

হায়দার, তুমি মনে করো তোমার স্কুল জীবনের কথা। ক্লাস সেভেনে যখন তুমি রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলে, আব্বু কী বলেছিল? “এইসব hobby রাখিস। কিন্তু main line mathematics আর science।”

তারপর এইচএসসিতে যখন তুমি humanities নিতে চেয়েছিলে, আম্মু কী বলেছিল? “এইদিকে গেলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”

আর এখন? এখন আমি সেই ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যতে’ আছি। engineer হয়েছি। কিন্তু আমার হৃদয়টা এখনো সেই ক্লাস সেভেনেই আটকে আছে।

হায়দার, তুমি কি জানো আজও আমার টেবিলের ড্রয়ারে সেই পুরাতন ডায়েরি আছে? যেখানে আমি গল্প লিখতাম? কবিতা লিখতাম? স্বপ্ন লিখতাম?

আজও মাঝে মাঝে সেই ডায়েরি খুলে দেখি। আর ভাবি – এই ছেলেটা কোথায় হারিয়ে গেল?

আম্মু-আব্বু আমার ভালো চেয়েছে। এটা আমি জানি। তারা চেয়েছে আমি ‘সফল’ হই। কিন্তু তাদের ‘সফলতার’ সংজ্ঞা আর আমার ‘সুখের’ সংজ্ঞা এক নয়।

তারা চেয়েছে আমি টাকা-পয়সা কামাই। সমাজে মাথা উঁচু করে থাকি। আর আমি চেয়েছি… কী চেয়েছি?

আমি চেয়েছি সকালে উঠে মনের আনন্দে লিখতে বসি। চেয়েছি আমার লেখা পড়ে কেউ হাসুক, কেউ কাঁদুক। চেয়েছি আমার কথায় কারো জীবনে একটুখানি অর্থ আসুক।

কিন্তু এখন আমি কী করি? সকালে উঠে excel sheet ভরি। মিটিং করি। প্রজেক্টের টার্গেট নিয়ে মাথা ঘামাই।

আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি এখন আরাশের সাথে একই ভুল করছি।

গতকাল আরাশ আমাকে বলেছে, “বাবা, আমি artist হব।” আমি প্রথম যে কথা বলেছি? “Artist হয়ে খাবি কী?”

হায়দার, তুমি কি বুঝেছো? আমি আমার আব্বু হয়ে গেছি। আমার আম্মু হয়ে গেছি।

আমি আরাশকে সেই পথেই ঠেলে দিচ্ছি যে পথে আমি নিজে অসুখী।

কিন্তু কী করব? আমার নিজের জীবনটাও তো আর পরিবর্তন করতে পারি না। এখন সংসার আছে। দায়িত্ব আছে।

নাকি পারি?

হায়দার, আমি কি পারি আবার লিখতে শুরু করতে? অন্তত রাতের বেলা? অন্তত weekend-এ?

আমি কি পারি আরাশকে বলতে যে “তুই যা হতে চাস, সেটাই হ। আমি তোর পাশে আছি।”?

আমি কি পারি আম্মু-আব্বুকে বোঝাতে যে success এর সংজ্ঞা শুধু টাকা আর পদ নয়?

হয়তো পারি না। কিন্তু চেষ্টা করতে পারি।

হায়দার, আমি তোমার কাছে একটা প্রতিজ্ঞা করছি। আগামীকাল থেকে আমি আবার লিখব। হয়তো ভালো হবে না। কিন্তু আমার মনের কথা হবে।

আর আরাশকে বলব – “তুই তোর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যা। আমার unfulfilled dreams তোর জীবনে ছায়া ফেলতে দেব না।”

এই চিঠিটা লিখে আমার মনটা অনেক হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে সেই ক্লাস সেভেনের ছেলেটার সাথে কথা বলেছি।

ভোর হয়ে আসছে। আজান হবে। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে তওবা করব। নিজের আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করার তওবা।

তুমি কি আমার সাথে থাকবে এই যাত্রায়?

ভালোবাসা নিয়ে, হায়দার (৩৯ বছর বয়সে নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টায়)

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *