দুপুর ২টায় খাওয়ার পর চোখে একটা অদ্ভুত ভার নেমে আসে। হ্যাপিকে বলি, “একটু চোখ বুজে নেই। শুধু ১০ মিনিট।” এই “একটু চোখ বুজে নেওয়া” এর মধ্যে যে কী ভয়াবহ ফাঁদ লুকিয়ে আছে, সেটা আমি জানি না।
হ্যাপি বলে, “বেশিক্ষণ ঘুমিও না। সন্ধ্যায় কাজ আছে।” আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলি, “না না। ঘুম না। শুধু চোখ বন্ধ করে একটু বিশ্রাম নেব।” এই কথাটা বলার সময় নিজেই বিশ্বাস করি।
সোফায় শুয়ে চোখ বন্ধ করি। মনে মনে বলি, “১০ মিনিট পর উঠব।” প্রথম ৫ মিনিট সত্যিই ঘুম আসে না। শুধু চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছি। মনে হয় যেন আমার কথাই ঠিক – এটা ঘুম না, শুধু রেস্ট।
কিন্তু ৬ষ্ঠ মিনিটে কী হয় সেটা আমি জানি না। অজ্ঞান হয়ে যাই। গভীর, অন্ধকার, নিরবচ্ছিন্ন ঘুম। যেন একটা কালো গর্তে পড়ে গেছি।
আরাশের ডাক শুনে চোখ খুলি। “আব্বু, ৫টা বেজে গেছে।” চোখ খুলে দেখি চারপাশ অন্ধকার হতে শুরু করেছে। ঘড়ির দিকে তাকাই – ৫:১৫। আমি ৩ ঘন্টার বেশি “চোখ বুজে” ছিলাম।
উঠে বসে মাথা ধরি। এত ভারী লাগছে যেন মাথার ভিতর সিমেন্ট ঢেলে দেওয়া হয়েছে। মুখ শুকনো, গলা কাঠ হয়ে গেছে। এটা কিসের বিশ্রাম? এটা তো আরো ক্লান্তি।
হ্যাপি এসে বলে, “দেখেছ? বলেছিলাম বেশিক্ষণ ঘুমিও না।” আমি বলি, “আমি ঘুমাইনি। শুধু চোখ বন্ধ করে ছিলাম।” কিন্তু নিজেই জানি এই কথায় কোনো সত্যতা নেই।
সন্ধ্যার কাজগুলো করতে পারছি না। যে কাজের জন্য বিশ্রাম নিয়েছিলাম, সেই কাজ করার শক্তিই নেই। বরং আরো ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
কেন এমন হয় আমার সাথে? “একটু চোখ বুজে নেব” বলে কেন ৩ ঘন্টা ঘুমিয়ে পড়ি? এটা কি আমার ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা? নাকি শরীরের দাবি?
রাতে খেতে বসে বুঝি সবচেয়ে বড় সমস্যা। খিদে নেই। দুপুরের সেই লম্বা ঘুমের কারণে সারা দিনের রিদম নষ্ট হয়ে গেছে। এখন না খিদে আছে, না ঘুম আসবে।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না? কেন ছোট একটা বিশ্রামও হয়ে যায় লম্বা ঘুম?” মনে হয় উত্তর পাচ্ছি – “তুমি নিজেকেই ঠকাচ্ছ।”
সত্যিই তো, আমি নিজেকে ঠকাই। জানি যে “চোখ বুজে নেব” মানে ঘুমিয়ে পড়ব। তবুও প্রতিবার একই কথা বলি। একই ভুল করি।
অফিসেও এমন হয়। লাঞ্চ ব্রেকে বলি “একটু চোখ বুজে নেব।” তারপর ২ ঘন্টা পর জেগে উঠি। বস রাগ করেন, সহকর্মীরা হাসাহাসি করে।
একবার টাইমার সেট করার কথা ভেবেছিলাম। ১০ মিনিট পর বেজে উঠবে। কিন্তু টাইমারের শব্দেও জাগিনি। গভীর ঘুমে এমনভাবে তলিয়ে গিয়েছিলাম যে কোনো শব্দই কানে যায়নি।
বন্ধু জামিউর বলে, “তুই কিভাবে এত গভীর ঘুম দিতে পারিস দুপুরে?” আমি বলি, “আমি ঘুমাই না। শুধু চোখ বুজে থাকি।” সেও হেসে ফেলে।
হ্যাপি একদিন বলেছিল, “তুমি যখন বল ‘চোখ বুজে নেব’, আমি বুঝে নিই ৩ ঘন্টা পর দেখা হবে।” তার এই কথায় বুঝি আমার কথার কোনো মূল্য নেই।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, রাতে যতই চেষ্টা করি এত গভীর ঘুম আসে না। রাতে ২ ঘন্টা জেগে থেকে অবশেষে ঘুমাই। কিন্তু দুপুরে “একটু চোখ বুজলেই” ৩ ঘন্টা।
হয়তো এটাই আমার শরীরের রিদম। হয়তো আমি একটা দিবানিদ্রাপ্রিয় মানুষ। কিন্তু তাহলে কেন মিথ্যা বলি? কেন বলি না যে আমি ৩ ঘন্টা ঘুমাব?
আজ আবার একই কথা বললাম, “একটু চোখ বুজে নেব।” হ্যাপি আর কিছু বলল না। শুধু মাথা নাড়ল। আরাশ বলল, “আব্বু, আবার সেই একই কথা।”
হয়তো একদিন সত্যিই ১০ মিনিটে উঠে যাব। হয়তো একদিন “চোখ বুজে নেওয়া” আর “ঘুমিয়ে পড়া” এর পার্থক্য বুঝব। কিন্তু আজকের মতো আবারো হেরে গেলাম নিজের কাছেই।
একটু ভাবনা রেখে যান