আরাশ রিপোর্ট কার্ডটা আমার হাতে দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। গণিতে ৪৫, ইংরেজিতে ৫২, বিজ্ঞানে ৪৮।
আমার হাত কাঁপছে।
“বাবা, আমি চেষ্টা করেছিলাম।” আরাশের গলায় কান্নার স্বর।
আমি কিছু বলতে পারছি না। কারণ আমি জানি এই ফলাফলের জন্য আরাশ দায়ী নয়। আমি দায়ী।
আমি কখনো আরাশের পড়াশোনা দেখি না। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে থাকি। রাতে লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আরাশের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখি না।
হ্যাপি তো কলেজে পড়েনি। সে গণিত বা বিজ্ঞান পড়াতে পারে না। আরাশের পড়াশোনার দায়িত্ব আমার ছিল।
কিন্তু আমি কী করেছি?
আমি ভেবেছি আরাশ নিজেই পড়ে নেবে। আমি ভেবেছি সে আমার মতো মেধাবী। তাকে সাহায্য করার দরকার নেই।
কিন্তু আরাশ তো আমি নই। তার আলাদা চ্যালেঞ্জ আছে। তার বোঝার গতি আলাদা। আমার উচিত ছিল তার পাশে বসে তাকে পড়াতে।
“আরাশ, এই ফলাফলে দুঃখ পাস না। আমি তোমাকে সাহায্য করব।”
কিন্তু আরাশের চোখে প্রশ্ন, “আগে কেন করোনি?”
আমি উত্তর দিতে পারি না।
আমার মনে পড়ল আমার ছোটবেলার কথা। আমার বাবাও আমার পড়াশোনা দেখতেন না। তিনি বলতেন, “নিজে পড়। আমার সময় নেই।” আমি নিজেই পড়ে ভালো ফলাফল করেছিলাম।
কিন্তু আরাশ আমি নই।
আমি আরাশের কাঁধে হাত রাখলাম। “আগামী মাস থেকে প্রতিদিন আমি তোমার সাথে পড়াশোনা করব।”
কিন্তু আরাশের মুখে কোনো আশার ছাপ নেই। সে জানে আমি এই প্রতিশ্রুতি আগেও দিয়েছি।
আমি বুঝতে পারছি, একটা খারাপ ফলাফল শুধু নম্বর নয়। এটা আমার ব্যর্থতার প্রমাণ। আমি একজন বাবা হিসেবে ব্যর্থ হয়েছি।
আমার বন্ধুদের ছেলেরা A+ পায়। তারা টিউটর রাখে, ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ায়। আমি আরাশকে কী দিয়েছি? একটা স্থানীয় স্কুল আর উপেক্ষা।
এই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। ভাবছিলাম, আরাশ বড় হয়ে আমাকে কী বলবে? “বাবা, তুমি আমার পড়াশোনার সময় কোথায় ছিলে?”
আমার বাবাও হয়তো এই একই অনুশোচনা করেছিলেন। তিনিও হয়তো ভেবেছিলেন, আমাকে আরো সময় দেওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু এই অনুশোচনা দিয়ে কী হবে?
পরদিন আমি আরাশের সাথে বসলাম। তার গণিতের বই খুললাম। দেখলাম সে সহজ যোগ-বিয়োগে ভুল করে। আমি বুঝলাম, তার ভিত্তি দুর্বল।
এই দুর্বলতার জন্য আরাশ দায়ী নয়। আমি দায়ী।
কিন্তু এখনও সময় আছে। আমি ঠিক করব।
আরাশ আমার ব্যর্থতার প্রমাণ হয়ে থাকবে না।
একটু ভাবনা রেখে যান