ফরম পূরণ করতে বসে হঠাৎ বুঝলাম আমি আস্তে আস্তে কাগজে পরিণত হয়ে যাচ্ছি। আমার নাম, ঠিকানা, জন্ম তারিখ, পিতার নাম – সবকিছু লিখতে লিখতে মনে হল আমি আর একজন জীবন্ত মানুষ নই। আমি একটা ফাইল।
প্রতিদিন কত ফরম পূরণ করি। চাকরির ফরম, ব্যাংকের ফরম, ডাক্তারের কাছে ফরম, স্কুলে ফরম। প্রতিটা ফরমে আমি আমার জীবনের একটুকরো রেখে দেই।
আমার জন্ম হয়েছে একটা ফাইলে। জন্ম নিবন্ধন ফরমে। সেখানে লেখা আছে আমি কবে, কোথায় জন্মেছি। কিন্তু সেখানে নেই আমার মায়ের সেই আনন্দের কথা যখন আমি প্রথম কাঁদলাম।
আমার শিক্ষা আছে সনদের পাতায়। সেখানে লেখা আমি কী পাস করেছি, কত নাম্বার পেয়েছি। কিন্তু সেখানে নেই সেই রাতের কথা যখন পরীক্ষার আগে ভয়ে ঘুম আসেনি।
আমার বিয়ে হয়েছে একটা রেজিস্ট্রার অফিসে। একটা খাতায় সই করে। সেখানে আছে হ্যাপির সাথে আমার বৈধ সম্পর্কের প্রমাণ। কিন্তু নেই সেই ভালোবাসার কথা যা আমাদের এক করেছে।
আরাশের জন্মও একটা ফাইলে। একটা ফরমে তার সব পরিচয়। কিন্তু সেখানে নেই সেই মুহূর্তের কথা যখন প্রথম তাকে কোলে নিয়েছিলাম।
আমার চাকরিও কাগজে। নিয়োগপত্র, বেতনের তালিকা, পদোন্নতির চিঠি। কিন্তু সেখানে নেই প্রথম চাকরি পাওয়ার দিনের সেই খুশির কথা।
এমনকি আমার মৃত্যুও হবে একটা কাগজে। মৃত্যু সনদে। সেখানে লেখা থাকবে আমি কবে মরেছি, কী কারণে। কিন্তু থাকবে না আমার জীবনের সব স্মৃতি।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, আমার আসল জীবন কি এই কাগজে আছে? নাকি আমার হৃদয়ে?”
কিন্তু এই সমাজ শুধু কাগজের জীবন দেখে। আমি কী মানুষ, কী ভাবি, কী স্বপ্ন দেখি – এসব তাদের দরকার নেই।
হ্যাপি বলে, “তুমি এত কাগজপত্র নিয়ে পড়ে থাক কেন?” আমি বলি, “এগুলো ছাড়া তো আমার কোনো পরিচয় নেই।”
আরাশ বলে, “আব্বু, এই কাগজগুলো কি আপনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?” আমি চুপ থাকি। কারণ জানি এই সমাজে কাগজই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অফিসে আমার একটা ফাইল আছে। সেখানে আছে আমার সব কাজের বিবরণ। কিন্তু নেই আমার সৎতার কথা, আমার চেষ্টার কথা।
ডাক্তারের কাছে আমার আরেকটা ফাইল। সেখানে আছে আমার সব রোগের তালিকা। কিন্তু নেই আমার মানসিক কষ্টের কথা।
ব্যাংকে আছে আমার অ্যাকাউন্টের ফাইল। সেখানে আছে আমার আয়-ব্যয়ের হিসাব। কিন্তু নেই আমার স্বপ্নের দাম।
এই ফাইলগুলোই এখন আমার পরিচয়। আমি আর হায়দার নই। আমি একগুচ্ছ কাগজ।
আমার আবেগ, আমার ভালোবাসা, আমার কষ্ট – এসব কোনো ফাইলে নেই। তাই এগুলো এই সমাজে অস্তিত্বহীন।
যদি একদিন আমার সব ফাইল পুড়ে যায়, তাহলে কি আমিও শেষ হয়ে যাব? নাকি আমার আসল অস্তিত্ব তখনও থাকবে?
হ্যাপির ভালোবাসায়, আরাশের হাসিতে, আমার স্মৃতিতে?
কিন্তু এই সমাজ তা মানবে না। তারা চাইবে কাগজ। প্রমাণপত্র। সনদ।
রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আমি কি একটা মানুষ যার ফাইল আছে? নাকি একটা ফাইল যার ভিতরে একটা মানুষ বন্দী?
আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে হয়তো আমি সম্পূর্ণভাবে কাগজ হয়ে যাব।
একটু ভাবনা রেখে যান