ব্লগ

ফাইল নম্বরে পরিণত হওয়া মানুষের করুণ কাহিনী

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ফাইল নম্বর ২৩৪৫৬৭৮

একটি কাল্পনিক গল্প


জাহিদ হোসেন নামটা শেষবার কবে শুনেছিলাম মনে নেই।


গল্পটা শুরু হয়েছিল একটা সাধারণ দুপুরে। অফিসের ক্যান্টিনে ভাত খেয়ে রেজিস্টার খাতায় সই করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম — আমার নামের জায়গায় লেখা “ফাইল-২৩৪৫৬৭৮।”

প্রথমে ভাবলাম ভুল হয়েছে। অ্যাডমিন সেকশনে গেলাম।

“ভাই, আমার নাম তো জাহিদ হোসেন। এখানে নম্বর কেন?”

লোকটা কম্পিউটারের দিকে তাকালো। তারপর আমার দিকে। তারপর আবার কম্পিউটারে।

“সিস্টেমে তো ২৩৪৫৬৭৮ই আছে। নাম কোথায় পাবো?”

“আমার নাম জাহিদ হোসেন!”

“সেটা তো আপনি বলছেন। সিস্টেমে প্রমাণ কই?”

আমি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সিস্টেমে প্রমাণ? আমি তো আমি। এর প্রমাণ কী লাগে?


সেই থেকে শুরু।

রূপান্তরটা রাতারাতি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে, ফোঁটায় ফোঁটায়, যেভাবে পাথরে জল পড়ে গর্ত হয় — ঠিক সেভাবে।

প্রথমে এলো কর্মচারী নম্বর। স্বাভাবিক ব্যাপার। সব অফিসেই থাকে।

তারপর এলো ট্যাক্স আইডি। তারপর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর। তারপর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর। পাসপোর্ট নম্বর। ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর।

প্রতিটা নম্বর একটু একটু করে আমার নামকে গ্রাস করেছে।

এখন আমি গুনে দেখেছি — আমার ২৭টা আলাদা নম্বর আছে। ২৭টা আলাদা সত্তা। কিন্তু একটাও জাহিদ হোসেন নয়।


অফিসে এখন কেউ আমার নাম জানে না।

বস ইন্টারকমে বলেন, “২৩৪৫৬৭৮ কে পাঠাও।”

সহকর্মী রাসেল বলে, “২৩৪৫৬৭৮, তোর ফাইলটা কোথায়?”

এমনকি পিয়ন করিম সাহেব, যিনি পনেরো বছর ধরে আমাকে চেনেন, তিনিও বলেন, “২৩৪৫৬৭৮ স্যার, চা দেব?”

একদিন সাহস করে বললাম, “করিম সাহেব, আমার নাম জাহিদ। জাহিদ হোসেন।”

তিনি অবাক হয়ে তাকালেন। যেন অচেনা কোনো শব্দ শুনেছেন।

“জাহিদ? সেটা কোন ফাইলের নাম?”


ব্যাংকে গেলাম। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বললাম, “আমার নাম জাহিদ হোসেন। অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলব।”

মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো, “অ্যাকাউন্ট নম্বর?”

“৭৭৮৮৯৯০০১১২২।”

“ঠিক আছে, ৭৭৮৮৯৯০০১১২২। কত টাকা তুলবেন?”

আমি বললাম, “আমার নাম জাহিদ।”

সে আমার দিকে তাকালো। চোখে বিরক্তি।

“স্যার, নাম দিয়ে তো ট্রানজ্যাকশন হয় না। নম্বর বলেন।”

আমি বুঝলাম — এই দুনিয়ায় নাম একটা অপ্রয়োজনীয় জিনিস। যেমন পরিশিষ্ট। থাকলেও হয়, না থাকলেও চলে।


হাসপাতালে গেলাম বুকে ব্যথা নিয়ে। রিসেপশনে বললাম নাম।

“রোগী নম্বর?”

“জানি না।”

“নম্বর ছাড়া রেকর্ড খুঁজব কীভাবে?”

“আমার নাম জাহিদ হোসেন। বয়স ৪৫। বাসা মিরপুরে।”

লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। যেন আমি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছি।

“স্যার, নাম দিয়ে সার্চ করলে হাজার হাজার জাহিদ হোসেন আসবে। নম্বর দেন।”

আমি ভাবলাম — হাজার হাজার জাহিদ হোসেন। আমরা সবাই একই নামে ডুবে যাচ্ছি। তাই নম্বর দিয়ে আলাদা করা হচ্ছে।

কিন্তু তাহলে নামের দরকার কী?


একদিন রাতে স্ত্রী সুমি জিজ্ঞেস করলো, “কী হয়েছে তোমার? চুপচাপ কেন?”

“সুমি, তুমি আমাকে কী বলে ডাকো?”

“মানে?”

“আমার নাম কী?”

সুমি হাসলো। “পাগল হয়ে গেলে নাকি? জাহিদ।”

আমি স্বস্তি পেলাম। অন্তত একজন আছে যে আমার নাম জানে।

কিন্তু পরের মুহূর্তে সুমি বললো, “তোমার অফিসের আইডি নম্বরটা কী? ট্যাক্স ফর্মে লাগবে।”

আমি চুপ করে রইলাম।


আমার ছেলে রাফিন সেভেনে পড়ে। একদিন ওর স্কুলে গেলাম অভিভাবক সভায়।

গেটে গিয়ে বললাম, “আমি রাফিনের বাবা।”

“অভিভাবক আইডি?”

“মানে?”

“আপনার অভিভাবক রেজিস্ট্রেশন নম্বর কত?”

আমি বললাম, “আমি জাহিদ হোসেন। রাফিনের বাবা।”

লোকটা বিরক্ত হলো। “স্যার, এখানে ৮০০ ছাত্র। সবার বাবা-মা মিলিয়ে ১৬০০ অভিভাবক। নম্বর ছাড়া কীভাবে বুঝব আপনি কার?”

আমি আমার পরিচয়পত্র বের করলাম। সেখানে আমার ছবি, নাম, জন্মতারিখ — সব আছে।

“এটা দিয়ে হবে না। অভিভাবক কার্ডে যে নম্বর আছে সেটা বলেন।”


সেই রাতে ঘুম এলো না।

শুয়ে শুয়ে ভাবলাম — আমি আসলে কে?

জাহিদ হোসেন? সেটা তো শুধু একটা শব্দ। কাগজে লেখা কিছু অক্ষর।

কিন্তু ২৩৪৫৬৭৮? সেটা সিস্টেমে আছে। ডাটাবেসে আছে। সার্ভারে সংরক্ষিত। সেটা “প্রমাণিত।”

তাহলে কোনটা আসল আমি?

যে নামে মা ডাকতেন? নাকি যে নম্বরে সিস্টেম চেনে?


একদিন অফিসে একটা মজার ঘটনা ঘটলো।

দুজন কর্মচারীর নম্বর ভুলে অদলবদল হয়ে গেছে। রহিম সাহেবের বেতন গেছে করিম সাহেবের অ্যাকাউন্টে।

এইচআর ডাকলো। সমস্যা সমাধানে তিন সপ্তাহ লেগেছে।

আমি ভাবলাম — যদি আমার নম্বর কারো সাথে অদলবদল হয়ে যায়, তাহলে আমি কি আর আমি থাকব?

নাকি অন্য কেউ হয়ে যাব?


মৃত্যুর কথা ভাবি মাঝে মাঝে।

আমি মারা গেলে কী হবে? খবরে কি লেখা হবে “জাহিদ হোসেন মারা গেছেন?” নাকি “ফাইল নম্বর ২৩৪৫৬৭৮ বন্ধ হয়েছে?”

আমার কবরে কি নাম লেখা থাকবে? নাকি একটা কিউআর কোড থাকবে — স্ক্যান করলে আমার সব নম্বর দেখা যাবে?

আমার নাতি-নাতনিরা কি বলবে “দাদু”? নাকি বলবে “২৩৪৫৬৭৮ দাদু”?

একটা ভয় জেঁকে বসেছে — আমার নামটা কি আমার আগেই মারা যাবে?


একদিন সুমিকে বললাম এই কথা।

সে হাসলো। “তুমি বেশি ভাবো।”

“ভাবব না? আমাকে কেউ নাম ধরে ডাকে না!”

“আমি তো ডাকি।”

“তুমি একজন। বাকি পৃথিবী?”

সুমি চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো, “জানো, আমার অফিসেও আমাকে ৪৫৬৭৮ বলে ডাকে।”

আমি অবাক হলাম। “তোমাকেও?”

“সবাইকে। এটাই নিয়ম এখন।”


রাফিন একদিন স্কুল থেকে এসে বললো, “বাবা, আমার রোল নম্বর কত জানো?”

“কত?”

“৩২। কিন্তু টিচার আমাকে নাম ধরে ডাকেন না। বলেন — ৩২, বোর্ডে এসো।”

আমার বুক কেঁপে উঠলো।

এই রোগ তাহলে আমার ছেলের মধ্যেও ঢুকে গেছে। সেও একদিন একটা নম্বর হয়ে যাবে।


একদিন সাহস করে বসকে বললাম, “স্যার, আমাকে নাম ধরে ডাকতে পারেন?”

বস অবাক হলেন। “মানে?”

“আমার নাম জাহিদ হোসেন। ২৩৪৫৬৭৮ না।”

বস কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কম্পিউটারে কিছু দেখলেন।

“ও, জাহিদ হোসেন। হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু নাম দিয়ে তো সার্চ করা যায় না। নম্বরটাই মনে থাকে।”

তিনি আবার কাজে মন দিলেন।

আমি বুঝলাম — এই যুদ্ধে আমি একা। এবং হেরে যাচ্ছি।


রাতে আয়নার সামনে দাঁড়াই।

একজন মানুষ দেখি। চোখ, নাক, মুখ — সব আছে। বয়সের ছাপ আছে। কপালে চিন্তার রেখা আছে।

কিন্তু এই মানুষটা কে?

জাহিদ হোসেন? নাকি ২৩৪৫৬৭৮?

আয়না উত্তর দেয় না।


একটা দিন আসবে যেদিন আমার শেষ নম্বরটাও বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ক্লোজড। অফিস ফাইল আর্কাইভড। ট্যাক্স আইডি নিষ্ক্রিয়।

সেদিন কি কেউ বলবে “জাহিদ হোসেন চলে গেছে?”

নাকি বলবে “কিছু নম্বর মুছে গেছে সিস্টেম থেকে?”


আজকাল একটা অভ্যাস হয়েছে।

রাতে ঘুমানোর আগে নিজেকে বলি — “আমি জাহিদ হোসেন। আমি জাহিদ হোসেন।”

বারবার বলি। যেন ভুলে না যাই।

কারণ আমি জানি — যেদিন আমি নিজেই ভুলে যাব, সেদিন সত্যিই আর কিছু থাকবে না।

শুধু থাকবে কিছু নম্বর।

যেগুলো একদিন মুছেও যাবে।


[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *