জুম্মার নামাজে হুজুর সাহেব বলছেন, “সুদ মহাপাপ। এক টাকা সুদ খাওয়া ৩৭ বার মায়ের সাথে জিনার সমান।” আমার গা শিউরে ওঠে। হুজুর আরো বলেন, “যারা সুদি ব্যাংকে টাকা রাখে তারাও সুদের পাপী।”
নামাজের পর বের হতে গিয়ে দেখি হুজুর সাহেব ডাচ বাংলা ব্যাংকের ATM থেকে টাকা তুলছেন।
আমার মাথা ঝিমঝিম করে।
আমি তার কাছে গিয়ে বলি, “হুজুর, আপনি তো এইমাত্র বললেন সুদি ব্যাংকে টাকা রাখা পাপ।” তিনি কেমন যেন অস্বস্তিতে পড়েন। বলেন, “এইটা তো সরকারি ব্যাংক।” আমি বলি, “কিন্তু এরাও তো সুদ দেয়।”
তিনি বলেন, “আমি তো সুদ নিই না। শুধু আসল টাকা তুলি।” আমি বলি, “কিন্তু হুজুর, আপনি বলেছেন রাখলেই পাপ।”
তিনি রেগে চলে যান।
বাড়ি ফিরে আমি হিসাব করি। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সেভিংসে ১৫০০০ টাকা আছে। এতে বছরে ৪% সুদ। মানে ৬০০ টাকা সুদ। আমি এই সুদ নিই না, সেটা দান করে দিই। কিন্তু টাকা রাখি কেন?
কারণ কোথায় রাখবো?
আমি ইসলামিক ব্যাংকের ওয়েবসাইট খুলি। দেখি তাদের “শরিয়াহ কমপ্লায়েন্ট” প্রোডাক্ট। কিন্তু মূল কাঠামো একই। তারাও টাকা দিয়ে ব্যবসা করে, লাভ করে। সেই লাভের অংশ গ্রাহককে দেয়। তফাৎ শুধু নামে – “সুদ” না বলে “লাভের অংশ” বলে।
হ্যাপি বলে, “তাহলে ইসলামিক ব্যাংকে টাকা রাখো।” আমি বলি, “সেটাও তো একই জিনিস। নাম ভিন্ন।”
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আমার বন্ধু তারেকের আব্বু বলেছেন টাকা ঘরে রাখলে চুরি যায়। তাই ব্যাংকে রাখতে হয়।” আমি বলি, “এইটা তো সত্যি কথা।” আরাশ বলে, “তাহলে হুজুর কেন বলেন ব্যাংকে রাখা পাপ?”
আমি কোনো উত্তর দিতে পারি না।
আমি ইউটিউবে “সুদ ও ইসলামিক ব্যাংকিং” নিয়ে ভিডিও দেখি। একদল আলেম বলেন ইসলামিক ব্যাংক সুদমুক্ত। অন্যদল বলেন এটাও সুদি সিস্টেমের অংশ।
আমি কনফিউজড হয়ে যাই।
আমি আমাদের এলাকার আরেক হুজুরের সাথে কথা বলি। তিনি বলেন, “ভাই, এই যুগে সুদ ছাড়া চলা সম্ভব না। তবে যতটা কম সম্ভব নেয়ার চেষ্টা করেন।” আমি বলি, “কিন্তু কোরআনে তো পরিষ্কার নিষেধ।”
তিনি বলেন, “সেই যুগ ছিল আলাদা। এখন তো পুরো দুনিয়ার অর্থনীতি সুদভিত্তিক।”
আমি ভাবি – আল্লাহর হুকুম কি যুগের সাথে পরিবর্তিত হয়?
আমি আরেকটা হিসাব করি। আমি যদি ব্যাংকে টাকা না রাখি, তাহলে:
- বেতন নিতে পারবো না (কোম্পানি ব্যাংকেই দেয়)
- বিদ্যুতের বিল দিতে পারবো না (অনলাইনে দিতে হয়)
- আরাশের স্কুলের ফি দিতে পারবো না (চেকের মাধ্যমে)
তাহলে আমি কিভাবে জীবনযাপন করবো?
আমি একটা ফতোয়া দেখি। “যদি কেউ বাধ্য হয়ে সুদি ব্যাংক ব্যবহার করে এবং সুদ না নেয়, তবে পাপ হবে না।” আমি ভাবি – এই “বাধ্য” এর সংজ্ঞা কী?
হ্যাপি বলে, “তুমি এত জটিল করে ভাবো কেন? আমরা সুদ নিই না, শুধু নিরাপদ রাখার জন্য ব্যাংক ব্যবহার করি।” আমি বলি, “কিন্তু আমাদের টাকা দিয়েই তো ব্যাংক সুদের কারবার করে।”
আমি একটা উদাহরণ ভাবি। আমি যদি জানি একজন মানুষ আমার টাকা দিয়ে মদ বিক্রি করবে, তবুও কি আমি তাকে টাকা দেবো?
কিন্তু ব্যাংকের বিকল্প কী?
আমি কিছু গ্রুপের সাথে যোগাযোগ করি যারা সুদমুক্ত অর্থনীতি নিয়ে কাজ করে। তারা বলে কো-অপারেটিভ সিস্টেম, কমিউনিটি ব্যাংকিং। কিন্তু এগুলো এত ছোট পরিসরে যে বাস্তবে কাজের না।
রাতে আমি প্রার্থনা করি – “হে আল্লাহ, আমি কী করবো? তুমি সুদ নিষেধ করেছো, কিন্তু সুদ ছাড়া চলার পথ দেখাও নি।”
স্বপ্নে দেখি একটা মরুভূমি। আমি পানির খোঁজ করছি। একমাত্র কুয়া আছে, কিন্তু সেই কুয়ার মালিক বলছে, “পানি পাবে, কিন্তু বিষ মেশানো।”
আমি তৃষ্ণায় মরছি। কিন্তু বিষ খেতে পারছি না।
সকালে ঘুম ভেঙে ভাবি – আমি কি হিপোক্রেট হয়ে গেছি? সুদের বিরোধিতা করি কিন্তু সুদি সিস্টেমের অংশ?
আমি আয়নায় মুখ দেখি। প্রশ্ন করি – আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে কোথায় দাঁড়াবো?
জবাব আসে না।
একটু ভাবনা রেখে যান