ফ্রিজের দরজা খুলে পাঁচ মিনিট ধরে তাকিয়ে আছি। হলুদ আলোটা আমার মুখে পড়েছে, ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগছে। একটা পেঁয়াজ, আধা বোতল পানি, কালকের ভাত। ঠিক এই জিনিসগুলোই ছিল দশ মিনিট আগে যখন ফ্রিজ খুলেছিলাম। কিন্তু এখনো তাকিয়ে আছি, যেন কোনো অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষায়।
দরজা বন্ধ করলাম। পাঁচ সেকেন্ড পর আবার খুললাম।
সেই একই পেঁয়াজ। সেই একই পানির বোতল। কালকের ভাত এখনো কালকেরই।
“কী খুঁজছ?” হ্যাপি রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করল।
“কিছু না।” আমি বললাম, কিন্তু দরজা বন্ধ করলাম না।
এটা কী এক অদ্ভুত আশা! আমি জানি ফ্রিজে কী আছে। আমি জানি নতুন কিছু আসার কথা না। তবুও প্রতিবার খুলি এই ভেবে যে, হয়তো এবারে অন্য কিছু পাব। হয়তো কোনো রহস্যময় খাবার হাজির হয়েছে।
আরাশ এসে বলল, “বাবা, তুমি আমার মতো করছ।”
“মানে?”
“আমিও তো এমনই করি। ফ্রিজ খুলি, কিছুই পছন্দ হয় না, বন্ধ করি। আবার খুলি।”
আমি হেসে ফেললাম। “সত্যি তো! আমরা দুজনেই একই কাজ করছি।”
কিন্তু হাসির পরে একটা অদ্ভুত চিন্তা মাথায় এল। আমি কি সত্যিই নতুন কিছু খুঁজছি? নাকি আমি খুঁজছি একটা স্বপ্ন? একটা সম্ভাবনা? একটা অপেক্ষা?
ছোটবেলায় যখন ফ্রিজ খুলতাম, তখন আসলেই অবাক হতাম। মা কখন কী রেখেছেন, জানা ছিল না। প্রতিবার খোলা একটা আবিষ্কার ছিল। কিন্তু এখন? এখন আমিই ফ্রিজে জিনিস রাখি। আমিই জানি কী আছে কী নেই। তবুও খুলি কেন?
ফ্রিজের আয়নার মতো দরজায় আমার মুখ দেখতে পেলাম। একটা আশাহত মানুষের চেহারা। যে জানে যা পাবে, কিন্তু তবুও অন্য কিছুর আশা রাখে।
“এটা কি আমার জীবনের গল্প নয়?”
চিন্তাটা মাথায় আসতেই আমার গলা শুকিয়ে গেল।
আমি কি সারাজীবনই এমন করছি না? একই জিনিসের আশায় বারবার একই জায়গায় তাকাচ্ছি? চাকরি খুঁজতে গিয়ে একই ধরনের অফিসে ঘুরছি। বন্ধুদের সাথে একই ধরনের কথা বলছি। স্বপ্ন দেখছি একই রকমের।
কিন্তু নতুন কিছু পাচ্ছি না।
হ্যাপি এসে দাঁড়াল পাশে। “হায়দার, তুমি ভাবছ কী?”
“ভাবছি, আমরা কেন জেনেশুনেও আশা রাখি? আমি জানি ফ্রিজে নতুন কিছু নেই। তবুও খুলি।”
“হয়তো আশাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।”
হ্যাপির কথায় আমি চমকালাম। সে ঠিক বলেছে। আশা। এই অযৌক্তিক, অবান্তর, অসম্ভব আশা।
আমি আবার ফ্রিজ খুললাম। এবারে অন্যভাবে তাকালাম। পেঁয়াজটাকে দেখলাম। আধা বোতল পানি দেখলাম। কালকের ভাত দেখলাম। এগুলো দিয়েই তো কিছু একটা হতে পারে। কিছু নতুন।
“আরাশ,” আমি ডাকলাম। “চল, দেখি এই পেঁয়াজ আর ভাত দিয়ে কী বানানো যায়।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। নতুন কিছু খুঁজে না পেলে, যা আছে তা দিয়েই নতুন কিছু বানাতে হয়।”
আরাশ খুশিতে হেসে উঠল। হ্যাপিও হাসল।
কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন থেকে গেল। এই যে ফ্রিজে বারবার তাকানো, এটা কি আমার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি? আমি কি সব জায়গায়ই এমন করি? চাই যা নেই, আর যা আছে তাকে দেখি না?
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরেকবার ফ্রিজ খুললাম। এবারে কোনো আশা নিয়ে নয়। শুধু দেখার জন্য। পেঁয়াজটা এখনো আছে। পানির বোতল এখনো আছে। কিন্তু কালকের ভাত নেই – আমরা সেটা দিয়ে পেঁয়াজি ভাত বানিয়েছিলাম।
দেখ, নতুন কিছু তো হলোই। আমি যা ভাবিনি, তা হলো।
হয়তো সমস্যা ফ্রিজে নয়। সমস্যা আমার দেখার চোখে। আমি যা দেখি না, তা আছে। আমি যা আশা করি, তা হয়তো অন্যভাবে আসে।
ফ্রিজের দরজা বন্ধ করতে যাওয়ার আগে আয়নার মতো সারফেসে আমার মুখ দেখলাম। এবারে আর আশাহত মুখ নয়। একটু হাসি আছে। কারণ আমি বুঝেছি – নতুন খাবার খুঁজতে গেলে নতুন রান্না করতে হয়। নতুন জীবন চাইলে, যা আছে তা দিয়েই শুরু করতে হয়।
কাল সকালে আবার ফ্রিজ খুলব। কিন্তু এবার অন্য চোখে দেখব।
একটু ভাবনা রেখে যান