আজ রিমোট ওয়ার্কের ছয় মাস। আর অফিসে যেতে হয় না। ট্রাফিক জ্যামে বসতে হয় না। বসের চোখের সামনে নাটক করতে হয় না। স্বাধীনতা। কিন্তু কেন মনে হচ্ছে বন্দিত্ব?
বেডরুমে একটা টেবিল। সেখানেই এখন আমার অফিস। সকালে ঘুম থেকে উঠে পাঁচ কদম হেঁটে কাজে বসি। দুপুরে খাওয়ার জন্য রান্নাঘরে যাই। সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে বিছানায় যাই।
পাঁচ কদমের জীবন।
প্রথম দিকে ভেবেছিলাম—কী চমৎকার! সকালে উঠে স্নান না করেই কাজে বসতে পারি। পাজামা পরেই মিটিং করতে পারি। ক্যামেরা অফ রেখে।
কিন্তু এক মাস পর বুঝলাম—বাড়ি আর বাড়ি নেই। অফিস হয়ে গেছে। আর অফিস আর অফিস নেই। বাড়িতে চলে এসেছে।
সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন রাত দশটায় ল্যাপটপে নোটিফিকেশন আসে। “আর্জেন্ট ইমেইল।” বেডরুম থেকে টেবিল মাত্র পাঁচ কদম। চলে যাই। কাজ করি। রাত দুটো পর্যন্ত।
অফিস থাকলে অন্তত একটা সীমা ছিল। অফিস টাইম, হোম টাইম। এখন সব মিশে একাকার।
সবচেয়ে মিস করি—সহকর্মীদের। অফিসের গল্প। চা খাওয়ার ফাঁকে হাসাহাসি। এখন দিনে দিনে শুধু কম্পিউটার স্ক্রিন আর নিজের সাথে কথা।
ভিডিও কলে সবাই স্মাইল দেয়। “How are you?” “I’m fine.” কিন্তু কেউ সত্যি জানে না কেমন আছি। আমিও জানি না তারা কেমন আছে।
হ্যাপি বলে, “তুমি সব সময় বাড়িতে থাকো, কিন্তু আমাদের সময় দাও না।” সত্য কথা। বাড়িতে আছি শারীরিকভাবে। কিন্তু মানসিকভাবে অফিসেই।
আরাশ স্কুল থেকে এসে বলে, “বাবা, আমার সাথে খেলবেন?” আমি বলি, “একটা মিটিং আছে।” মিটিং ঘরেই। পাশের রুমে।
রিমোট ওয়ার্ক মানে বাড়িতে কাজ। কিন্তু বাড়ি আর বাড়ি থাকে না। কাজের জায়গা হয়ে যায়।
মাঝে মাঝে বাইরে বেরোতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কোথায় যাব? কাফেতে বসে কাজ? সেটাও তো একই। অন্য জায়গায় অফিস।
অফিসে থাকলে অন্তত “বাড়ি ফিরি” বলে একটা অনুভূতি ছিল। এখন কোথায় ফিরব? বেডরুম থেকে ড্রইংরুমে?
সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার—একাকীত্ব। দিনভর কারো সাথে সরাসরি কথা বলি না। ভিডিও কলে কথা বলি। কিন্তু সেটা কি আসলেই কথা বলা?
রিমোট ওয়ার্কের সুবিধা অনেক। ট্রাভেল টাইম সেভ। অফিস রেন্ট সেভ। ফ্লেক্সিবিলিটি। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমার কী লস হচ্ছে?
সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের যে দরকার—মানুষের সাথে মিশা, কথা বলা, একসাথে কিছু করা—সেটা হারিয়ে যাচ্ছে।
অফিস শুধু কাজের জায়গা নয়। সামাজিকতারও জায়গা। সেই সামাজিকতা ভার্চুয়াল হয়ে গেলে আর কি সেটা সামাজিকতা?
কিন্তু অফিস ফিরে যেতেও ইচ্ছা করে না। ট্রাফিক, চাপ, বসের নাটক—এগুলো আর সহ্য হবে না।
তাহলে সমাধান কী? হাইব্রিড? সপ্তাহে কয়েকদিন অফিস, কয়েকদিন বাড়ি?
নাকি রিমোট ওয়ার্কিং স্পেস? যেখানে অন্য রিমোট ওয়ার্কাররা কাজ করে?
সমস্যা হচ্ছে—বাড়ি আর কাজের মধ্যে সীমারেখা। সেটা বজায় রাখতে হবে। নইলে দুটোই নষ্ট।
রিমোট ওয়ার্ক স্বাধীনতা দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতায় কি আমি আরো বেশি বন্দি?
একটু ভাবনা রেখে যান