ব্লগ

সপ্তাহান্তের ঘুমের অপরাধ

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

শুক্রবার সন্ধ্যায় মনে করি, “আগামীকাল সকাল সকাল উঠে অনেক কাজ করব।” পরিকল্পনা করি ভোর ৬টায় উঠব। ব্যায়াম করব। বই পড়ব। ঘর গোছাব। হ্যাপি ও আরাশের সাথে সময় কাটাব। এত সুন্দর একটা দিনের স্বপ্ন দেখি।

কিন্তু শনিবার সকাল ১০টায় চোখ খোলে। প্রথমেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মনটা খারাপ হয়ে যায়। “আরেকটা সকাল নষ্ট হয়ে গেল।” এই অপরাধবোধ দিয়ে দিন শুরু।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবি, কত মানুষ এখন কত কাজ করছে। কেউ বাগান পরিচর্যা করছে। কেউ ঘর পরিষ্কার করছে। কেউ পরিবারের সাথে বেড়াতে গেছে। আর আমি? আমি এখনো বিছানায় পড়ে আছি।

হ্যাপি ও আরাশ নাশতা করে ফেলেছে। তারা আমার জন্য অপেক্ষা করেনি। হ্যাপি বলে, “তুমি উঠলে?” তার কণ্ঠে একটা হতাশার সুর। যেন সে জানত আমি দেরি করে উঠব।

আরাশ বলে, “আব্বু, আপনি তো বলেছিলেন সকাল সকাল উঠে আমার সাথে খেলবেন।” তার এই কথায় গলা শুকিয়ে যায়। আমি আমার সন্তানের সাথে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেটা ভেঙে ফেলেছি।

গোসল করতে গিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখি। মুখে একটা অপরাধীর ছাপ। যেন আমি কোনো বড় অন্যায় করেছি। কিন্তু অন্যায়টা কী? শুধু একটু বেশি ঘুমিয়েছি।

কিন্তু এই “একটু বেশি” কেন এত ভারী লাগে? কেন মনে হয় আমি জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ নষ্ট করে ফেলেছি? সপ্তাহান্তের সকালগুলো তো এতই মূল্যবান।

অফিসে যেতে হয় না। কোনো তাড়া নেই। এমন সময়ে দেরি করে ঘুমানো কি ভুল? নাকি এটাই স্বাভাবিক? কিন্তু তাহলে এই অপরাধবোধ কেন?

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “সপ্তাহান্তে একটু বেশি ঘুমানো কি পাপ? নাকি আমি অযথা নিজেকে দোষ দিচ্ছি?” মনে হয় উত্তর আসছে – “সময়ের মূল্য জান।”

হ্যাপি দুপুরে বলে, “তুমি সারাদিন মন খারাপ করে আছ কেন?” আমি বলতে পারি না যে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার অপরাধবোধে ভুগছি। এটা শুনতে কতই না হাস্যকর।

বন্ধুদের ফোন করলে শুনি তারা সকাল থেকে কত কাজ করেছে। জামিউর বলল, “আজ সকালে বাজার করেছি, বাচ্চাদের নিয়ে পার্কে গেছি।” সাইফুল বলল, “সকাল থেকে বাগান পরিচর্যা করেছি।” আমি চুপ করে শুনি।

সন্ধ্যায় হিসেব করি আজ কী করেছি। তেমন কিছুই না। দুপুরে একটু ঘুরেছি। কিছু কেনাকাটা করেছি। বাসায় বসে টিভি দেখেছি। একটা অসম্পূর্ণ দিন।

রাতে শুয়ে ভাবি, “আগামীকাল সকাল সকাল উঠব।” কিন্তু জানি এই প্রতিজ্ঞা আবার ভাঙা হবে। রবিবার সকালেও একই অবস্থা হবে।

কেন পারি না সপ্তাহান্তের সকালগুলো কাজে লাগাতে? কেন এই মূল্যবান সময় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিই? শরীর বিশ্রাম চায়, নাকি মন পালিয়ে বেড়াতে চায়?

হয়তো এই অপরাধবোধটাই ভুল। হয়তো সপ্তাহান্তে দেরি করে ঘুমানো অপরাধ নয়। হয়তো এটাই শরীরের দাবি। সারা সপ্তাহের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার উপায়।

কিন্তু তবুও মনের কোথাও একটা খচখচানি থেকে যায়। মনে হয় আরো কিছু করা যেত। আরো কিছু অর্জন করা যেত। এই দুঃখবোধ নিয়েই আবার সপ্তাহ শুরু করতে হয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *