ব্লগ

যে গলিতে হাঁটি সেটা কি আসলেই আছে?

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গলি

একটি কাল্পনিক গল্প


বাজার থেকে ফেরার পথে মাসুদ হোসেন গলির মুখে দাঁড়িয়ে থমকে গেলেন।

এই গলিটা কি আগেও ছিল?


প্রশ্নটা অদ্ভুত। বারো বছর ধরে এই গলি দিয়ে হাঁটছেন। চোখ বন্ধ করেও পথ চিনতে পারেন। প্রতিটা ইট, প্রতিটা ফাটল, প্রতিটা দাগ — সব মুখস্থ।

কিন্তু আজ কেন মনে হচ্ছে এই গলি প্রথমবার দেখছেন?

দেয়ালগুলো একই। রঙ একই। গন্ধ একই — স্যাঁতসেঁতে, পুরনো।

তাহলে কী বদলেছে?

মাসুদ হোসেন বুঝতে পারলেন না।


তিনি পা বাড়ালেন। মাটিতে পা পড়লো।

কিন্তু সেই মুহূর্তে একটা প্রশ্ন এলো — এই মাটিটা কি সত্যি?

পায়ের নিচে শক্ত কিছু অনুভব করছেন। কিন্তু সেই অনুভূতিটা কি আসল? নাকি মস্তিষ্ক তৈরি করছে?

স্কুলে পড়েছিলেন — আমরা আসলে কিছু দেখি না, মস্তিষ্ক দেখায়। চোখ শুধু আলো নেয়, মস্তিষ্ক ছবি বানায়।

তাহলে এই গলি কি মস্তিষ্কের বানানো ছবি? বাইরে কি আসলেই কিছু আছে?


গলির ডানপাশে শফিক মিয়ার বাড়ি। লাল রঙের গেট। গেটের সামনে একটা টবে গাছ।

মাসুদ হোসেন থামলেন।

এই বাড়িটা কি আছে?

তিনি জানেন শফিক মিয়া থাকেন এখানে। স্ত্রী, দুই ছেলে। বড় ছেলে ঢাকায় চাকরি করে।

কিন্তু এই তথ্যগুলো কি সত্য? নাকি তাঁর মাথায় বসানো স্মৃতি?

যদি কেউ তাঁর মস্তিষ্কে ভুয়া স্মৃতি ঢুকিয়ে দিয়ে থাকে? যদি শফিক মিয়া বলে আসলে কেউ না থাকে?


একটা বিড়াল বেরিয়ে এলো গলি থেকে। ধূসর রঙের। চোখ দুটো হলুদ।

বিড়ালটা মাসুদ হোসেনের দিকে তাকালো।

মাসুদ হোসেন ভাবলেন — এই বিড়াল কি আমাকে দেখছে?

যদি দেখে, তাহলে আমি আছি। কারণ না থাকলে দেখবে কীভাবে?

কিন্তু বিড়ালটাই যদি না থাকে? যদি এটাও মস্তিষ্কের তৈরি?

তাহলে কে কাকে দেখছে?


মাসুদ হোসেন হাঁটতে লাগলেন। ধীরে ধীরে।

প্রতিটা পদক্ষেপে মনে হচ্ছে মাটি সরে যাচ্ছে। যেন হাঁটছেন কিন্তু এগোচ্ছেন না।

গলি যেন লম্বা হয়ে যাচ্ছে।

আগে দুই মিনিটে পার হতেন। আজ পাঁচ মিনিট হয়ে গেছে, শেষ দেখা যাচ্ছে না।

নাকি সময়ও মিথ্যা? ঘড়িতে পাঁচ মিনিট দেখাচ্ছে, কিন্তু আসলে কত সময় গেছে কে জানে?


বাড়ি পৌঁছালেন।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবার সেই প্রশ্ন — এই বাড়িটা কি আছে?

নীল রঙের দরজা। ডানপাশে একটা জানালা। জানালায় সাদা পর্দা।

সব চেনা। কিন্তু চেনা মানেই কি সত্য?

স্বপ্নেও তো চেনা জায়গা দেখি। স্বপ্নে মনে হয় সব সত্য। জেগে উঠলে বুঝি মিথ্যা ছিল।

এখন কি তিনি জেগে আছেন? নাকি ঘুমিয়ে?


দরজা খুললেন।

ভেতরে স্ত্রী রওশন বসে আছেন। টিভি দেখছেন।

“এত দেরি কেন?”

মাসুদ হোসেন উত্তর দিলেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন।

রওশন কি আছে?

এই মুখটা তিনি বিশ বছর ধরে দেখছেন। প্রতিটা রেখা চেনেন। চোখের কোণের ভাঁজ চেনেন। হাসির ধরন চেনেন।

কিন্তু এই রওশন কি সত্যি?

যদি পুরোটাই মাথার ভেতরের খেলা হয়? যদি তিনি আসলে একা কোথাও পড়ে আছেন, আর মস্তিষ্ক এই পুরো জীবন বানিয়ে দেখাচ্ছে?


“কী হয়েছে? অসুস্থ লাগছে?”

রওশনের গলা শুনলেন। কিন্তু গলাটা কি আসল?

কানে শব্দ ঢুকছে। মস্তিষ্ক সেটাকে রওশনের গলা বলছে। কিন্তু আসলে কী ঢুকছে কে জানে?

“কিছু হয়নি।”

নিজের গলা শুনলেন। সেটাও কি আসল?


ছেলে তাহসিন ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

“বাবা, খেলনা এনেছ?”

মাসুদ হোসেন ব্যাগ থেকে একটা গাড়ি বের করলেন। প্লাস্টিকের, লাল রঙের।

তাহসিন খুশি হয়ে নিয়ে গেল।

মাসুদ হোসেন ভাবলেন — এই ছেলেটা কি আছে?

সাত বছর আগে জন্ম হয়েছিল। হাসপাতালে। ডাক্তার ছিল, নার্স ছিল। রওশন ছিল।

কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো কি সত্য? নাকি প্রোগ্রাম করা?


রাতে খেতে বসলেন।

ভাত। মাছ। ডাল।

চামচ তুললেন। মুখে দিলেন। চিবোলেন। গিললেন।

কিন্তু এই খাবার কি আসলে আছে?

পেটে কিছু যাচ্ছে মনে হচ্ছে। কিন্তু পেট কি আছে? শরীর কি আছে?

তিনি নিজের হাতের দিকে তাকালেন। পাঁচটা আঙুল। নখ। রেখা।

এই হাত কি তাঁর?


রওশন জিজ্ঞেস করলেন, “আজ তোমাকে অন্যরকম লাগছে।”

“কেমন?”

“জানি না। যেন এখানে নেই।”

মাসুদ হোসেন চমকে উঠলেন।

এখানে নেই?

রওশন কি সত্য বলছে? তিনি কি সত্যিই এখানে নেই?


রাতে ঘুমাতে গেলেন।

বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

যদি ঘুমিয়ে যান, আগামীকাল কি জাগবেন?

যদি জাগেন, সেই জাগাটা কি সত্য হবে?

নাকি এখনকার জাগাটাই আসলে ঘুম, আর ঘুমের পর সত্যিকারের জাগা আসবে?


তিনি চোখ বন্ধ করলেন।

অন্ধকার।

এই অন্ধকারটা কি আছে? নাকি চোখ বন্ধ বলে মস্তিষ্ক অন্ধকার দেখাচ্ছে?

চোখ খুললেন।

ঘর দেখলেন। রওশনকে দেখলেন। পাশে ঘুমাচ্ছেন।

এই দৃশ্য কি সত্য?


হঠাৎ একটা ভয় হলো।

যদি এই পুরো পৃথিবীটাই না থাকে?

যদি শুধু তিনি থাকেন? একা? কোথাও?

আর বাকি সব — গলি, বাড়ি, রওশন, তাহসিন — সব তাঁর মস্তিষ্কের তৈরি?

তাহলে তিনি কে?


পরের দিন সকালে উঠলেন।

জানালা দিয়ে আলো আসছে।

সেই আলোটা কি সত্য?

বাইরে পাখি ডাকছে।

সেই পাখি কি আছে?


বাথরুমে গেলেন। আয়নায় নিজেকে দেখলেন।

একজন মানুষ। চল্লিশোর্ধ্ব। চুলে পাক ধরেছে। চোখের নিচে কালি।

এই মানুষটা কি তিনি?

যদি আয়না মিথ্যা দেখায়? যদি তিনি আসলে অন্যরকম দেখতে?

নাকি তিনি আসলে কিছুই দেখতে নন? শুধু একটা চিন্তা? একটা ধারণা?


অফিসে গেলেন।

সহকর্মীরা কথা বলছে। কম্পিউটারে কাজ হচ্ছে। ফোন বাজছে।

সব স্বাভাবিক।

কিন্তু মাসুদ হোসেনের কাছে কিছুই স্বাভাবিক লাগছে না।

এই অফিস কি আছে? এই মানুষগুলো কি আছে?

নাকি পুরোটা একটা সিমুলেশন?


দুপুরে ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছিলেন।

পাশের টেবিলে রফিক সাহেব বসে কাগজ পড়ছেন।

মাসুদ হোসেন ভাবলেন — রফিক সাহেব কি জানেন তিনি নেই?

নাকি রফিক সাহেবেরও একই সন্দেহ? তিনিও ভাবছেন মাসুদ হোসেন নেই?

হয়তো সবাই সবার সম্পর্কে সন্দেহ করছে।

হয়তো কেউই নেই।


বাড়ি ফেরার পথে সেই গলি।

আজও দাঁড়ালেন।

গলিটা আছে।

নাকি নেই?


তিনি ঢুকলেন।

হাঁটলেন।

আজ গলি ছোট লাগলো। কাল লম্বা লেগেছিল।

কোনটা সত্য?


বাড়ি পৌঁছে দরজা খুললেন।

রওশন বললেন, “আজ তাড়াতাড়ি?”

মাসুদ হোসেন বললেন, “গলি ছোট ছিল।”

রওশন অবাক হলেন। “গলি তো একই আছে।”

“আছে কি?”

রওশন তাঁর দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ।

তারপর বললেন, “তুমি ঠিক আছো?”

মাসুদ হোসেন উত্তর দিলেন না।

কারণ তিনি জানেন না তিনি ঠিক আছেন কিনা।

তিনি জানেন না তিনি আছেন কিনা।


সেই রাতে তাহসিন জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, পৃথিবী কি সত্যি?”

মাসুদ হোসেন চমকে উঠলেন।

“কেন জিজ্ঞেস করছিস?”

“এমনি। স্কুলে একজন বলল সব স্বপ্ন।”

মাসুদ হোসেন ছেলের দিকে তাকালেন।

এই সাত বছরের ছেলে একই প্রশ্ন করছে যেটা তাঁকে পাগল করে দিচ্ছে।

“জানি না, বাবা।”

তাহসিন অবাক হলো। “জানো না?”

“না। কেউ জানে না।”


রাতে বিছানায় শুয়ে মাসুদ হোসেন ভাবলেন — হয়তো এটাই উত্তর।

কেউ জানে না।

কেউ কোনোদিন জানবে না।

আমরা সবাই একটা গলিতে হাঁটছি। গলি আছে কি নেই জানি না। শুধু হাঁটছি।

হাঁটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।


পরদিন সকালে আবার সেই গলি।

মাসুদ হোসেন আর দাঁড়ালেন না।

শুধু হাঁটলেন।

গলি থাকুক বা না থাকুক — হাঁটা থামানো যায় না।


[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *