ব্লগ

যে যাত্রায় গন্তব্য নেই

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

চোখের পলকে চলে গেলাম ১৯৫০ সালে। তারপর ২১০০ সালে। তারপর ১৮০০ সালে। মধ্যযুগ, প্রাচীনকাল, ভবিষ্যতের কোনো এক অজানা পৃথিবী – সব জায়গায় ঘুরে এলাম।

কিন্তু প্রতিটি যুগে, প্রতিটি সময়ে পৌঁছে দেখি আমি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।

নিজের ভেতরের সেই একই কোণে। যেখানে কথা নেই। যোগাযোগ নেই। বোঝাপড়া নেই।

১৯৫০ সালে গিয়ে দেখি মানুষ সহজ জীবনযাপন করছে। ভাবলাম, এই সময়ে হয়তো আমার কথা বলার সমস্যা থাকবে না। কিন্তু দেখি, সেখানকার মানুষেরাও আমাকে বুঝতে পারছে না।

২১০০ সালে গিয়ে দেখি প্রযুক্তি এত উন্নত যে মানুষ মনে মনে কথা বলতে পারে। ভাবলাম, এখানে তো আর কণ্ঠস্বরের দরকার নেই। কিন্তু দেখি, মনের ভাষাও আমি জানি না।

১৮০০ সালে গিয়ে দেখি মানুষ হাতে লিখে যোগাযোগ করে। ভাবলাম, আমি তো লিখতে পারি। কিন্তু দেখি, আমার হাতের লেখা সেই যুগেও অপাঠ্য।

মধ্যযুগে গিয়ে দেখি মানুষ শুধু ইশারায় কথা বলে। ভাবলাম, এটা তো আমার জন্য সুবিধা। কিন্তু দেখি, আমার হাত সেখানেও অবশ।

প্রাচীনকালে গিয়ে দেখি মানুষ আঁকিবুকি করে ভাব প্রকাশ করে। ভাবলাম, এই পদ্ধতি চেষ্টা করি। কিন্তু দেখি, আমার আঁকা ছবি কেউ বুঝতে পারে না।

ভবিষ্যতে গিয়ে দেখি মানুষ শুধু চোখের ইশারায় সব কিছু বলে ফেলে। ভাবলাম, আমার চোখ তো আছে। কিন্তু দেখি, আমার চোখের ভাষা সেখানেও বিদেশি।

হাজার বছর পেছনে গিয়ে দেখি আদিম মানুষ গুহায় বাস করে। শুধু গর্জন করে কথা বলে। ভাবলাম, এত সহজ ভাষা আমি পারব। কিন্তু দেখি, আমার গর্জনও তারা বোঝে না।

লক্ষ বছর এগিয়ে গিয়ে দেখি মানুষ আলোর মাধ্যমে কথা বলে। ভাবলাম, এই নতুন মাধ্যম শিখব। কিন্তু দেখি, আমার আলো নিভে যায়।

তখন বুঝলাম, সমস্যা সময়ে নয়। সমস্যা স্থানে নয়। সমস্যা আমার অস্তিত্বের গভীরে।

আমি যেখানেই যাই, নিজেকেই নিয়ে যাই। আর নিজের সাথেই আটকে থাকি।

টাইম মেশিন দিয়ে সময় পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু নিজেকে পরিবর্তন করা যায় না।

আমি এখনো সেই হায়দার যে কথা বলতে পারে না। যে চিঠি লিখতে পারে না। যে ইশারা করতে পারে না।

শত যুগ ঘুরে এসেও আমি একই জায়গায় – নিজের নিরবতার কারাগারে।

আল্লাহ, এই কি আমার নিয়তি? সব পথ ঘুরে এসেও একই বিন্দুতে ফিরে আসা?

হয়তো আসল যাত্রা বাইরের নয়। ভেতরের।

কিন্তু সেই পথ আমি কীভাবে খুঁজব?

হয়তো এই প্রশ্নই আমার শুরুর জায়গা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *