আজ আরাশ এসে প্রশ্ন করল, “বাবা, চাঁদে কেন মানুষ থাকতে পারে না?”
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই সে বলল, “অপেক্ষা করো, গুগল করে দেখি।”
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার ছেলে আমার কাছে উত্তর খোঁজে না। গুগলের কাছে খোঁজে।
আমাদের বাবা আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর জানতেন। অন্তত আমাদের তাই মনে হতো। আমরা তাদের কাছে যেতাম। তারা বুঝিয়ে দিতেন।
এখন আমাদের সন্তানরা গুগলের কাছে যায়।
আমি আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি মনে করো গুগল আমার চেয়ে বেশি জানে?”
সে ভেবে বলল, “গুগল সব জানে। তুমি কিছু কিছু জানো।”
এই উত্তর আমাকে ভাবিয়ে তুলল। গুগল কি সত্যিই সব জানে?
গুগল জানে চাঁদের তাপমাত্রা কত। জানে কেন সেখানে বাতাস নেই। কিন্তু গুগল জানে না আরাশের মন কেমন আছে।
আমি জানি আরাশ রাতে কেন ভয় পায়। জানি কোন কথায় তার মন খারাপ হয়। কোন গল্প শুনলে সে খুশি হয়।
এইসব কথা গুগল জানে না।
আমাদের বাবারা হয়তো সায়েন্সের সব তথ্য জানতেন না। কিন্তু আমাদের জানতেন।
তারা জানতেন আমাদের স্বপ্ন। আমাদের ভয়। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ।
এখন আমরা সন্তানদের চেয়ে গুগল আমাদের সন্তানদের বেশি জানে বলে মনে করি।
কিন্তু এটা কি ঠিক?
গুগল জানে আরাশ কী সার্চ করেছে। কোন ভিডিও দেখেছে। কতক্ষণ কোন সাইটে ছিল।
কিন্তু আমি জানি আরাশ কেন সেইসব সার্চ করেছে। তার মনে কী প্রশ্ন ছিল।
গুগল ডেটা দেয়। আমি কনটেক্সট দিই।
গুগল বলে “চাঁদে অক্সিজেন নেই।” আমি বলি “তাই চাঁদে গেলে আমাদের অক্সিজেন নিয়ে যেতে হবে। এটা খুব কঠিন।”
গুগল তথ্য দেয়। আমি বোঝাই।
আমাদের বাবারা আমাদের হাত ধরে শেখাতেন। আমাদের সাথে বসে ব্যাখ্যা করতেন। আমাদের ভুল সংশোধন করতেন।
এখন আমাদের সন্তানরা একা একা গুগল করে। কোনো ব্যাখ্যা নেই। কোনো আলোচনা নেই।
তারা উত্তর পায়। কিন্তু বোঝে না।
আমি লক্ষ করেছি – আরাশ যখন গুগল করে তথ্য পায়, তখন আরও প্রশ্ন তৈরি হয়। কিন্তু সেইসব প্রশ্ন সে আমার কাছে আনে না। আবার গুগল করে।
এভাবে সে একা একা একটা জ্ঞানের জগত তৈরি করে। যেখানে আমার কোনো ভূমিকা নেই।
আমাদের বাবাদের সাথে আমাদের জ্ঞান আদান-প্রদান হতো। আমরা প্রশ্ন করতাম। তারা উত্তর দিতেন। আবার প্রশ্ন করতাম।
এই পুরো প্রক্রিয়াটা ছিল মানবিক। ব্যক্তিগত।
এখন আমাদের সন্তানদের জ্ঞান অর্জন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। প্রশ্ন করো। উত্তর পাও। শেষ।
কোনো আবেগ নেই। কোনো সম্পর্ক নেই।
আমি ভাবি – আমরা কি আমাদের সন্তানদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি? তারা কি আমাদের থেকে কম নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে?
একদিকে এটা ভালো। তারা স্বাবলম্বী হচ্ছে। নিজেরাই তথ্য খুঁজে নিতে পারছে।
অন্যদিকে এটা দুঃখজনক। আমাদের সাথে তাদের জ্ঞানের সম্পর্ক কমে যাচ্ছে।
আমি এখন চেষ্টা করি আরাশ যখন গুগল করে, তখন তার পাশে বসি। দেখি সে কী পেয়েছে। ব্যাখ্যা করি। আলোচনা করি।
এভাবে গুগল আর আমি একসাথে আরাশকে শেখাই।
গুগল তথ্য দেয়। আমি প্রেম দিই।
গুগল উত্তর দেয়। আমি সাহায্য দিই।
গুগল জানে। আমি বুঝি।
আর বোঝানোই বাবাদের সবচেয়ে বড় কাজ।
তথ্য দেওয়ার কাজ গুগল করতে পারে। কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে শেখানোর কাজ শুধু বাবারাই পারে।
যুগে যুগে এটাই বাবাদের বিশেষত্ব।
একটু ভাবনা রেখে যান