পাকা চুল ও অপূর্ণ তালিকা
চুল ছোট করতে গিয়েছিলাম সেদিন। নাপিত — বয়স্ক একজন, হাতে কাঁচির বদলে এখন মেশিন — আমার মাথার পেছনে আঙুল বুলাতে বুলাতে বলল, “ভাই, পাক ধরেছে। এখান থেকে শুরু হয়েছে।” কথাটা সে বলল এমনভাবে, যেন আবহাওয়ার খবর দিচ্ছে — সাধারণ, নিরাসক্ত। আমি হাসলাম। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কোথাও একটা চোট লাগল — ছোট্ট একটা সুই ফোটানোর মতো, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না কিন্তু ভেতরে ভেতরে টনটন করে। পাকা চুল মানে সময়ের হিসাব। আর সময়ের হিসাব মানে অনিবার্যভাবে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া — কী করতে চেয়েছিলাম, আর কী করতে পেরেছি?
বিশ বছর বয়সে আমার একটা তালিকা ছিল। সেই তালিকা ছিল আমার জীবনের রোডম্যাপ, আমার ভবিষ্যতের ব্লুপ্রিন্ট। একটা নীল মলাটের ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলাম — হাতের লেখা তখন কত সুন্দর ছিল, কত আত্মবিশ্বাসী ছিল প্রতিটি অক্ষর: “ত্রিশের মধ্যে ভালো চাকরি — এমন চাকরি যা সম্মান এনে দেবে, টাকা এনে দেবে, পরিচয় এনে দেবে। বত্রিশের মধ্যে নিজের বাড়ি — ঢাকায়, ভালো এলাকায়, যেখানে বাবা-মা এসে থাকতে পারবে। পঁয়ত্রিশে বিদেশ ভ্রমণ — ইউরোপ, আইফেল টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুলব, আল্পসের বরফ ছুঁয়ে দেখব।” এই তালিকা তখন মনে হতো জীবনের সারসংক্ষেপ — এগুলো হলেই জীবন সফল, না হলে ব্যর্থ।
আজ সাঁইত্রিশ। সেই নীল ডায়েরিটা কোথায় হারিয়ে গেছে জানি না। হয়তো কোনো বাক্সের তলায় পড়ে আছে, হয়তো কোনো বাড়ি বদলের সময় ফেলে দেওয়া হয়েছে আরো অনেক পুরনো জিনিসের সাথে। কিন্তু তালিকাটা মনে আছে — প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি স্বপ্নের ওজন। নিজের বাড়ি এখনো ভাড়া বাসাতেই থাকি। বিদেশ যাইনি — পাসপোর্টে শুধু নিজের ছবি, কোনো ভিসার সিল নেই। চাকরিটা আছে, কিন্তু সেটা ‘ভালো’ কিনা — এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আগে জানতে হবে ‘ভালো’-র সংজ্ঞা কী, আর সেই সংজ্ঞা গত সতেরো বছরে এত বার পাল্টেছে যে আমি আর চিনতে পারি না।
তাহলে কি আমি ব্যর্থ? এই প্রশ্নটা রাতে এসে বসে বুকের ওপর, ঠিক যখন ঘুম আসতে চায়। তালিকার তিনটি আইটেমের দুটি অপূর্ণ — এই হিসাবে আমি ষাট শতাংশের বেশি ব্যর্থ। কিন্তু অন্য একটা গলা — যেটা বয়সের সাথে জোরালো হয়েছে — ফিসফিস করে বলে: নাকি তালিকাটাই ছিল ভুল? নাকি বিশ বছরের সেই ছেলে জানতই না জীবন কাকে বলে, সুখ কাকে বলে, সাফল্য আসলে কোথায় লুকিয়ে থাকে?
আরাশ গতকাল রাতে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে, হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করেছ?” প্রশ্নটা এমনভাবে এল, যেন আকাশ থেকে পাথর পড়ল। আমি থমকে গেলাম। এগারো বছরের ছেলে — সে কী জানে আমার স্বপ্নগুলো কী ছিল? সে কী জানে সেই নীল ডায়েরির কথা, সেই তালিকার কথা? তাহলে প্রশ্নটা কেন করল? হয়তো সে টের পেয়েছে আমার চোখে কোথাও একটা ছায়া আছে। একটা অতৃপ্তির ছায়া। একটা না-পাওয়ার ক্ষত যা আমি লুকাতে চাই কিন্তু পারি না। বাচ্চারা এসব টের পায় — তারা শব্দ শোনে না, তারা নীরবতা পড়তে পারে।
যৌবনে মনে হতো জীবনটা একটা পরীক্ষা — প্রশ্নপত্র দেওয়া আছে, সিলেবাস জানা, শুধু ভালো করে পড়তে হবে আর উত্তর লিখতে হবে। আমি নিশ্চিত ছিলাম সবচেয়ে ভালো ফল করব। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। কিন্তু পরীক্ষাটা কখন শেষ হলো জানিই না। কোনো ঘণ্টা বাজল না, কোনো ইনভিজিলেটর এসে খাতা নিয়ে গেল না। আর ফলাফল? ফলাফল কোথায়? কে দেবে সেই সার্টিফিকেট যাতে লেখা থাকবে — তুমি পেরেছ, তুমি সফল, তুমি জিতেছ?
রাতে ঘুমানোর আগে অভ্যাস হয়ে গেছে হিসাব করার। আজ দিনটায় কী করলাম? কী অর্জন করলাম? কতটুকু এগোলাম সেই অদৃশ্য গন্তব্যের দিকে? বেশিরভাগ দিনই উত্তর আসে না। দিনগুলো পিছলে যায় — অফিস, বাড়ি, খাওয়া, ঘুম — কোনো বিশেষ চিহ্ন না রেখে। আর আমি শুয়ে থাকি অন্ধকারে, ভাবি, এভাবেই কি কেটে যাবে বাকি জীবন? এক একটা দিন, এক একটা মাস, এক একটা বছর — বালির মতো আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে পড়বে?
হ্যাপি মাঝে মাঝে বলে, বিরক্ত হয়ে, “তুমি কেন এত চিন্তা কর? মুখটা এত গম্ভীর কেন সারাক্ষণ?” আমি বলি, “চিন্তা করি না তো।” মিথ্যা। সাদা মিথ্যা। আমি সারাক্ষণ চিন্তা করি। এমনকি যখন হাসি, তখনও মাথার পেছনে একটা গণনাযন্ত্র চলতে থাকে — কত বছর বাকি, কতটুকু করা হয়েছে, কতটুকু বাকি। ভাবি, যৌবনের সেই আমি — সেই বিশ বছরের দাম্ভিক ছেলে — যদি টাইম মেশিনে চড়ে এসে এই জীবন দেখত, কী বলত? সে হয়তো আমাকে করুণার চোখে দেখত। বলত, “এই তোমার লড়াই? এই তোমার জয়? ভাড়া বাসা, মাঝারি চাকরি, কোনোদিন প্লেনেও ওঠনি?” আর আমি কী উত্তর দিতাম? চুপ করে থাকতাম? নাকি বলতাম — তুমি বোঝো না, জীবন শুধু তালিকা টিক করা নয়?
অফিসে যাওয়ার পথে প্রতিদিন দেখি তরুণদের দল। টি-শার্ট পরা, কানে এয়ারপড, হাতে কফির কাপ। তাদের হাঁটায় একটা তাড়া আছে — যেন দেরি হয়ে যাচ্ছে কোথাও, যেন পৃথিবী তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের চোখে একটা নিশ্চয়তা — তারা জানে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কীভাবে পৌঁছাবে। আমিও একদিন এভাবে হেঁটেছি। একই তাড়া, একই নিশ্চয়তা, একই দম্ভ। কিন্তু এত হাঁটার পর কোথায় পৌঁছেছি? নাকি প্রশ্নটাই ভুল? নাকি পৌঁছানো বলে কিছু নেই — শুধু হাঁটা আছে, শুধু পথ আছে, গন্তব্য একটা মরীচিকা?
বাবার পুরনো জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে একটা ডায়েরি পেয়েছিলাম। তার হাতের লেখায় একটা লাইন চোখে পড়ল: “স্বপ্ন দেখার চেয়ে স্বপ্ন ভাঙার অভিজ্ঞতা বেশি মূল্যবান।” বিশ বছর আগে এই লাইন পড়লে হাসতাম। ভাবতাম হেরে যাওয়া মানুষের সান্ত্বনা। কিন্তু এখন বুঝি বাবা কী বলতে চেয়েছিলেন। স্বপ্ন ভাঙলে আমরা শিখি জীবনের আসল চেহারা — যে চেহারা পোস্টারে থাকে না, বইয়ে লেখা থাকে না। শিখি মানুষের সীমাবদ্ধতা — যে আমরা সব পারি না, সব পাই না, সব হতে পারি না। আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা — আনন্দের নতুন সংজ্ঞা। আনন্দ শুধু তালিকা সম্পূর্ণ করায় নেই। আনন্দ আছে সকালের চায়ে, আরাশের হাসিতে, হ্যাপির পাশে শুয়ে তার শ্বাসের শব্দ শোনায়।
আরাশের জন্য আমার অনেক স্বপ্ন আছে। চাই সে ভালো পড়াশোনা করুক, ভালো মানুষ হোক, সুখী হোক। কিন্তু মাঝরাতে কখনো কখনো প্রশ্ন জাগে — এই স্বপ্নগুলো কি আসলে তার জন্য, নাকি আমার নিজের অপূর্ণতার প্রতিফলন? আমি কি চাই সে সেই কাজগুলো করুক যা আমি করতে পারিনি — বিদেশে পড়ুক, বড় কিছু হোক, সেই তালিকা সম্পূর্ণ করুক যা আমি পারিনি? নাকি চাই সে তার নিজের তালিকা বানাক, নিজের স্বপ্ন দেখুক, নিজের পথে হাঁটুক — এমনকি সেই পথ যদি আমার স্বপ্নের বিপরীতেও যায়?
গতকাল একটা পুরনো ছবি দেখছিলাম। পঁচিশ বছরের আমি। কনভোকেশনের দিন। কত আত্মবিশ্বাসী মুখ! চোখে কত স্বপ্ন, ঠোঁটে কত নিশ্চয়তা! সেই ছেলে ভাবত অনুশোচনা মানে ব্যর্থতা — যে অনুশোচনা করে সে হেরে গেছে। কিন্তু এখন জানি, অনুশোচনা মানে ব্যর্থতা নয়। অনুশোচনা মানে জীবন যাপন করা — পুরোপুরি, সততার সাথে। যে কখনো অনুশোচনা করেনি, সে হয়তো কখনো ঝুঁকি নেয়নি, কিছু চায়নি, কিছু হারায়নি। অনুশোচনা হলো পরিপক্বতার সার্টিফিকেট — যা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দেয় না, জীবন দেয়।
যৌবনের অহংকার ছিল আমার জ্বালানি — সেই জ্বালানি দিয়ে আমি দৌড়েছি, লড়েছি, অনেক দূর এসেছি। মধ্যবয়সের অনুশোচনা আমার কম্পাস — যা দেখিয়ে দেয় কোথায় ভুল করেছি, কোথায় সামলাতে হবে, কোথায় আরো ভালো করতে পারি। দুটোই দরকার। দুটোই আমার। কিন্তু কোনটা বেশি দরকার — অহংকার নাকি অনুশোচনা, জ্বালানি নাকি কম্পাস — এই প্রশ্নের উত্তর এখনো জানি না। হয়তো কোনোদিন জানব। হয়তো জানার দরকার নেই। হয়তো এই না-জানার মধ্যেই আছে জীবনের আসল স্বাদ।
একটু ভাবনা রেখে যান