গতকাল সাইফুলের সাথে দেখা। দুই বছর পর। আমরা দুজনেই একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ালাম। হাত মেলালাম না। আলিঙ্গন করলাম না।
কেন?
কোভিড শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের মন থেকে সেই ভয় যায়নি। অভ্যাস হয়ে গেছে দূরত্ব রাখার।
আমি ভাবি – আমরা কি আর আগের মতো কাছাকাছি আসতে পারব?
মহামারীর আগে আমরা কত স্বাভাবিকভাবে একে অপরকে ছুঁয়ে দিতাম। হাতে হাত, কাঁধে হাত। এসব ছিল আমাদের ভালোবাসার ভাষা।
এখন স্পর্শ মানে সংক্রমণের ভয়। কাছে আসা মানে বিপদে পড়া।
আরাশ একদিন বলল, “বাবা, আমি মামাকে জড়িয়ে ধরতে পারি?”
আমি ইতস্তত করলাম। বললাম, “একটু দূরে থাকো।”
কিন্তু এই ‘দূরে থাকো’ শুধু শরীরের দূরত্ব নয়। মনের দূরত্বও তৈরি করছে।
হ্যাপি বলে, “এখন সবার সাথে দেখা করতে ভয় লাগে।”
ভয় কেন? কারণ আমরা ভুলে গেছি কীভাবে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক রাখতে হয়।
মাস্ক পরে কথা বলায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন মুখ দেখলে অস্বস্তি লাগে।
অনলাইন মিটিংয়ে কথা বলায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন সামনাসামনি বসে কথা বলতে অস্বস্তি লাগে।
আমাদের এক প্রতিবেশী গত সপ্তাহে বলল, “এখন বন্ধুদের বাড়িতে যেতে মন চায় না।”
কেন? কারণ আমরা ঘরে বসে থাকায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বাইরের পৃথিবী অচেনা লাগে।
সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার – আমাদের সন্তানরা এই দূরত্বকে স্বাভাবিক মনে করছে।
আরাশ বলে, “অনলাইনে কথা বলাই তো সহজ।”
কিন্তু অনলাইনে কি সেই উষ্ণতা আছে যা সামনাসামনি কথা বলায় থাকে?
আমি লক্ষ করেছি – মহামারীর পর আমাদের কথাবার্তা কমে গেছে। আগে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতাম। এখন ১০ মিনিট কথা বলে বিদায় নিই।
কেন? কারণ আমরা ভুলে গেছি কীভাবে গভীর কথা বলতে হয়। কীভাবে সময় কাটাতে হয়।
আমাদের সম্পর্কগুলো ভাসা ভাসা হয়ে গেছে। কারো সাথে গভীর সংযোগ নেই।
মহামারীর সময় আমরা ভেবেছিলাম এটা সাময়িক। শীঘ্রই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
কিন্তু আমি দেখছি – আমাদের আচরণ পাল্টে গেছে। আমাদের মানসিকতা পাল্টে গেছে।
আমরা সাবধানী হয়ে গেছি। সন্দেহপ্রবণ হয়ে গেছি। অনেক কিছু নিয়ে ভয় পাই।
হ্যাপির সাথে বাজারে গেলে দেখি সে কাউকে স্পর্শ করে না। দূরত্ব রাখে। মাস্ক পরে।
এই অভ্যাসগুলো এখন আমাদের স্বভাবের অংশ হয়ে গেছে।
আমি ভাবি – এই পরিবর্তন কি স্থায়ী? আমরা কি আর আগের মতো হতে পারব?
আমাদের মা-বাবার জমানায় অতিথি এলে তাকে জড়িয়ে ধরতেন। খাওয়াতেন। একসাথে বসতেন।
এখন অতিথি এলে আমরা দূরত্ব রাখি। মাস্ক পরি। তাড়াতাড়ি বিদায় দিই।
এই পরিবর্তন আমাদের সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আমাদের আতিথেয়তা, আমাদের সৌহার্দ্য, আমাদের ভালোবাসার প্রকাশ – সবকিছু সংকুচিত হয়ে গেছে।
আমি চেষ্টা করি আরাশকে বোঝাতে – মানুষের সাথে কাছাকাছি থাকাটা জরুরি। স্পর্শ করাটা জরুরি।
কিন্তু সে বলে, “তাহলে অসুখ হবে।”
এই ভয় তার মনে বসে গেছে। আমাদের সবার মনে বসে গেছে।
আমি ভাবি – আমরা কীভাবে এই ভয় কাটাব? কীভাবে আবার স্বাভাবিক হব?
হয়তো সময় লাগবে। হয়তো আরও কয়েক বছর লাগবে। কিন্তু আমাদের চেষ্টা করতে হবে।
কারণ মানুষ সামাজিক প্রাণী। আমাদের একে অপরের প্রয়োজন আছে। কাছাকাছি থাকার প্রয়োজন আছে।
ভার্চুয়াল সংযোগ দিয়ে সেই প্রয়োজন মেটানো যায় না।
আমাদের ফিরে আসতে হবে আগের সেই জীবনে। যেখানে মানুষ মানুষের কাছে আসত। স্পর্শ করত। ভালোবাসত।
মহামারী শেষ হয়েছে। কিন্তু মহামারীর মানসিক প্রভাব এখনো আছে।
এই প্রভাব কাটাতে হবে। নতুবা আমরা মানুষ হিসেবে আরও একা হয়ে যাব।
আর একাকীত্ব সবচেয়ে বড় মহামারী।
একটু ভাবনা রেখে যান