আজ সকালে যখন সরকারি অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, আমার হাতে একটা ফাইল – একটা কাগজের স্তূপ যার মধ্যে আমার পুরো অস্তিত্ব বন্দী। ফাইলটা ভারী লাগছে, যেন এর ভিতরে শুধু কাগজ নয়, আমার সব স্বপ্ন, সব আশা চাপা পড়ে আছে। হাতের তালুতে ঘাম জমছে। মুখ শুকিয়ে কাঠ।
পাশেই একজন বৃদ্ধ মানুষ বসে আছেন, তার পকেটে একটা কুঁচকানো কাগজের প্যাকেট। চোখে একটা অদ্ভুত হতাশা, যেন হাজার বছরের পুরনো ক্লান্তি। বুঝতে পারছি, উনিও আমার মতো এই কাগজের জালে আটকে গেছেন। উনি বলছেন, “বাবা, তিন মাস ধরে একই কাগজ নিয়ে ঘুরছি। কেউ বলে সিল নেই, কেউ বলে সাক্ষী লাগবে, কেউ বলে ফটোকপি ভুল।” তার গলার স্বরে একটা অদৃশ্য চিৎকার মিশে আছে।
আমি শুনছি, আর নিজের ভিতরে একটা যন্ত্র গুঁজে দেওয়া অনুভব করছি। এই কাগজগুলো আসলে কী? এগুলো তো শুধু কিছু কালির দাগ। সাদা কাগজে কালো দাগ। কিন্তু এই দাগগুলোই যেন আমাদের জীবন-মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করছে। এই কালির দাগ ছাড়া আমি কেউ না। আমার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হলে এই কাগজ লাগবে। আমার সন্তানের স্কুলে ভর্তি হতে হলে এই কাগজ। আমার চাকরি পেতে হলে এই কাগজ। এমনকি মরে গেলেও এই কাগজ।
হঠাৎ মনে পড়ল আরাশ গতকাল প্রশ্ন করেছিল, “আব্বু, আমাকে কেন এত কাগজ-পত্র দিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে আমি আরাশ? আমি তো জানি আমি কে।” আমি তখন কী উত্তর দিয়েছিলাম? মনে পড়ছে না। হয়তো চুপ থেকেছিলাম। কারণ আমিও জানি না উত্তর।
গলা শুকিয়ে আসছে। ছোটবেলায় বাবা বলতেন, “পড়ালেখা করো, সৎ থাকো, সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু এই অফিসে যারা সবচেয়ে সহজে কাজ করিয়ে নিচ্ছে, তারা কি সৎ? নাকি তাদের হাতে আছে সেই যাদুকরী শক্তি – কুঁচকানো টাকার নোট? আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি, আর মনে হয় আমি কি মুখোশ পরে আছি? নাকি মুখোশটাই আমার আসল চেহারা?
আমার পেছনে একটা মেয়ে কাঁদছে। তিক্ত কান্না। ওর বাচ্চা অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তির জন্য সার্টিফিকেট লাগবে। কিন্তু সার্টিফিকেটের জন্য লাগবে আরও দশটা কাগজ। প্রতিটা কাগজের জন্য আলাদা আলাদা অফিস। প্রতিটা অফিসে আলাদা আলাদা কেরানি। প্রতিজন কেরানি যেন একেকজন দরজার পাহারাদার। আর আমরা? আমরা যেন ভুতুড়ে প্রাসাদে হারিয়ে যাওয়া পথিক।
আমি ভাবছি, আল্লাহর কাছে কি আমাদের এই কাগজের প্রয়োজন আছে? আমার নামাজের জন্য কি কোনো সার্টিফিকেট লাগে? আমার দোয়ার জন্য কি কোনো অনুমতিপত্র দরকার? আমার ভালোবাসার জন্য কি কোনো ফরম পূরণ করতে হয়? তাহলে এই পৃথিবীতে কেন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্যও এত কাগজ?
সামনের কাউন্টারে একজন কেরানি বলছে, “কাল আসেন, আজ অফিসার সাহেব নেই।” কিন্তু আমি জানি, অফিসার সাহেব ভিতরে আছেন। উনার গাড়ি পার্কিংয়ে দেখেছি। উনি শুধু চান না এই “সাধারণ মানুষদের” সাথে কথা বলতে। আমরা তো যন্ত্রের মতো – সঠিক ইনপুট দিলে সঠিক আউটপুট বের হবে। কিন্তু যন্ত্রটা যদি নষ্ট থাকে? যদি প্রোগ্রামিংয়েই ত্রুটি থাকে?
আমার পেটে একটা অদ্ভুত মোচড় উঠছে। মনে পড়ল হ্যাপি রাতে জিজ্ঞেস করেছিল, “আজ কী হলো?” আমি বলেছিলাম, “কিছু না।” কিন্তু আসলে কী হয়েছিল? আমার ভিতরের মানুষটা একটু একটু করে মরে যাচ্ছিল। প্রতিটা কাউন্টারে, প্রতিটা ফাইলে, প্রতিটা সিলে।
হঠাৎ মনে পড়ল আরাশের কথা। ও বারান্দায় বসে রাস্তার মানুষ দেখে। ওর চোখে কৌতূহল। ও জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, ওই মানুষটা এত তাড়াহুড়া কেন করছে? ওই মেয়েটা কেন কাঁদছে?” কী ভাবে ও? ওর চোখে এই পৃথিবী কেমন? আমি কি ওকে এই কাগজের জাল সম্পর্কে কী বলব? কী শেখাব? যে সৎ থাকো, কিন্তু কাজ করাতে হলে ঘুষ দাও? যে পড়ালেখা করো, কিন্তু সার্টিফিকেট আরও গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানের চেয়ে?
আমার হাতের ফাইলটা এখন আরও ভারী লাগছে। মনে হচ্ছে এর ভিতরে শুধু আমার নয়, সেই বৃদ্ধের, কাঁদতে থাকা মেয়েটার, আর এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সবার চিৎকার বন্দী হয়ে আছে। নীরব চিৎকার। কারণ আমরা চিৎকার করলে “অভদ্র” হয়ে যাই। আমাদের কাজ আরও দেরি হয়। আমরা “কালো তালিকা”ভুক্ত হই।
সূর্য মাথার উপরে উঠে আসছে। ঘাম ঝরছে। আমি ভাবছি, এই সূর্যের উদয়ের জন্য কোনো অনুমতি লাগে না। বৃষ্টি পড়ার জন্য কোনো সার্টিফিকেট দরকার হয় না। বাতাস বওয়ার জন্য কোনো ফরম পূরণ করতে হয় না। তাহলে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য কেন এত কাগজ? আমাদের মানুষ হওয়ার জন্য কেন এত প্রমাণপত্র?
একটা কাক উড়ে গেল। ওর কি কোনো পরিচয়পত্র আছে? ওর জন্মসনদ কোথায়? ও কীভাবে প্রমাণ করে যে ও একটা কাক? আমি কি মানুষ হিসেবে কাকের চেয়েও কম স্বাধীন?
আমি কি ভুল পথে আছি? নাকি এই কাগজের রাজত্বেই আসল ভুল? আর এই প্রশ্নটা আমি কাকে করব? কোন অফিসে গিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর চাইব? তারও কি কোনো ফরম আছে? কোনো ফি? কোনো সময়সীমা?
আমার নম্বর ডাকা হলো। আমি এগিয়ে গেলাম। কিন্তু কেউ কি শুনতে পেল আমার ভিতরের চিৎকার? কেউ কি বুঝতে পারল যে আমি শুধু একটা কাগজ জমা দিচ্ছি না, আমার একটুকরো আত্মা বিক্রি করছি?
একটু ভাবনা রেখে যান