আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারছি না।
এই মুখটা কে? এই চোখ দুটো কার?
পনের বছর আগে যে হায়দার হ্যাপিকে বিয়ে করেছিল, সে কোথায়?
আমি তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।
আমার ভিতর একটা অচেনা মানুষ বাস করে। প্রতিদিন সকালে সে উঠে। অফিসে যায়। কাজ করে। বাড়ি ফেরে। খায়। ঘুমায়।
কিন্তু আমি কোথায়?
হ্যাপি আমার দিকে তাকায়। কিন্তু সে কি আমাকে দেখে? নাকি সে ওই অচেনা মানুষটাকে দেখে?
আমি তার সাথে কথা বলি। কিন্তু কার কণ্ঠস্বর বের হয়? আমার, নাকি ওই অচেনা মানুষটার?
আমার হাত দিয়ে সে তার হাত ছোঁয়। কিন্তু আমি কিছু অনুভব করি না।
যেন আমি একটা যন্ত্র। প্রেম করার যন্ত্র। সংসার করার যন্ত্র।
কিন্তু যন্ত্রের কি অনুভূতি থাকে?
রাতে শুয়ে আমি ভাবি—কখন আমি হারিয়ে গেলাম?
কোন দিন? কোন মুহূর্তে?
নাকি আমি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছি? যেমন চিনি পানিতে মিশে যায়?
হ্যাপি বলে, “তুমি আজকাল অন্যমনস্ক থাক।”
আমি বলি, “না তো।”
কিন্তু সে ঠিক বলেছে। আমি এখানে নেই। আমি কোথাও নেই।
আমি একটা স্বপ্ন। নিজের দেখা স্বপ্ন।
সকালে যখন চোখ খুলি, ভাবি—আমি কি সত্যি জেগেছি? নাকি আরেকটা স্বপ্ন দেখছি?
আমার জীবন একটা অভিনয়। আমি একটা চরিত্রে অভিনয় করছি। ‘স্বামী’ নামের চরিত্র।
কিন্তু আসল হায়দার কোথায়?
সে কি দর্শকের আসনে বসে এই অভিনয় দেখছে?
আমি তাকে খুঁজি। ভিড়ের মধ্যে। আয়নার পেছনে। স্মৃতির গভীরে।
কিন্তু পাই না।
হয়তো সে আর নেই। হয়তো আমিই তাকে হত্যা করেছি। ধীরে ধীরে। দিন দিন।
দায়িত্বের নামে। বাস্তবতার নামে।
এখন আমি একটা খোলস। ভিতরে কিছু নেই।
হ্যাপি সেই খোলসকে ভালোবাসে। কিন্তু আমাকে ভালোবাসে কি?
আমি যদি বলি, “আমি তোমার স্বামী নই। আমি একটা ভূত। তোমার স্বামী কোথাও হারিয়ে গেছে”—তাহলে সে বিশ্বাস করবে?
নাকি ভাববে আমি পাগল হয়ে গেছি?
হয়তো আমিই পাগল।
হয়তো প্রেম বলে কিছু নেই। আমি যা ভেবেছিলাম প্রেম, সেটা ছিল ভ্রম।
এখন ভ্রম কেটে গেছে। আমি দেখতে পাচ্ছি সত্য।
সত্য হলো—আমরা দুটো অচেনা মানুষ। একই ঘরে বাস করি। কিন্তু চিনি না।
আমাদের প্রেমও অচেনা। আমাদের বিয়েও অচেনা।
আমরা একটা নাটক করছি। দর্শক কেউ নেই।
কিন্তু নাটক চলতেই থাকে।
আমি সেই নাটকের বন্দি।
বের হতে চাই। কিন্তু জানি না কীভাবে।
হয়তো বের হওয়ার কোনো পথ নেই।
হয়তো এটাই জীবন। একটা অন্তহীন নাটক।
আমি অভিনয় করতে থাকি। মৃত্যু পর্যন্ত।
হায়দার নামের চরিত্রে।
একটু ভাবনা রেখে যান