আজকাল আমার জীবন যেন একটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। সকালে ঘুম থেকে উঠি। ফোনে এলার্ম। নাশতা করি। একই জিনিস। একই সময়। কাজ শুরু করি। একই রুটিন।
মনে হয় আমি একটা প্রোগ্রামড রোবট।
গতকাল হঠাত ভাবলাম – আমি কি আসলেই আমার জীবন নিয়ন্ত্রণ করছি? নাকি জীবন আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে?
প্রতিদিন সকালে ফোনের এলার্ম বাজে। আমি উঠি। কিন্তু যদি এলার্ম না বাজত? আমি কি নিজে নিজে উঠতে পারতাম?
আমি জানি না। কারণ আমি চেষ্টাই করি না।
আমার দিন শুরু হয় ফোনের নোটিফিকেশন দেখে। ইমেইল চেক করে। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করে। এসব আমি সচেতনভাবে করি না। যন্ত্রের মতো করি।
হ্যাপি বলে, “তুমি সবসময় ব্যস্ত থাকো। কিন্তু কী করো জানি না।”
আমিও জানি না। আমার দিন কেটে যায়। কিন্তু কী করলাম, সেটা মনে থাকে না।
আমি বুঝতে পারি – আমার জীবন autopilot mode-এ চলছে। আমি সচেতনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না।
কী খাব? অ্যাপ বলে দেয়। কোথায় যাব? গুগল ম্যাপ বলে দেয়। কী দেখব? ইউটিউব বলে দেয়। কী কিনব? ই-কমার্স সাইট বলে দেয়।
আমার নিজের কোনো ইচ্ছা নেই। কোনো পছন্দ নেই।
সবকিছু বলে দেওয়া। আমি শুধু অনুসরণ করি।
এই অবস্থা থেকে বেরোনোর জন্য গত সপ্তাহে একটা পরীক্ষা করলাম। একদিন সকালে এলার্ম সেট করলাম না। ফোন বন্ধ রেখে দিলাম।
দেখতে চাইলাম আমি কেমন অনুভব করি।
প্রথমে খুব অস্বস্তি লাগল। কয়টা বাজে জানি না। কী করব জানি না। হাতে সময় আছে মনে হলো। কিন্তু সেই সময় কীভাবে কাটাব বুঝতে পারলাম না।
আমি বুঝলাম – আমি নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি।
ছোটবেলায় আমাদের দিন ছিল অপরিকল্পিত। সকালে ঘুম ভাঙত রোদের আলোয়। না হলে মায়ের ডাকে। বন্ধুরা এলে খেলতে যেতাম। না এলে বই পড়তাম।
সবকিছু ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। জীবন্ত।
এখন সবকিছু প্রোগ্রামড। নির্ধারিত।
আরাশের দিনও এমন হতে শুরু করেছে। সকালে ওঠে ট্যাবে ভিডিও দেখে। তারপর পড়তে বসে। নির্দিষ্ট সময়ে খায়। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমায়।
আমি চিন্তিত – সে কি নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু করে?
একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কী করতে চাও?”
সে বলল, “জানি না। তুমি বলো।”
এই উত্তর আমাকে ভয় পাইয়ে দিল। আমার ছেলে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে না।
আমরা সবাই এমন হয়ে যাচ্ছি। নিজের ইচ্ছাহীন। নিষ্ক্রিয়।
প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে।
আমরা ভাবতে ভুলে গেছি। এখন আমরা অন্যদের চিন্তা অনুসরণ করি।
আমি এখন চেষ্টা করি সপ্তাহে একদিন সব যন্ত্র বন্ধ রাখতে। নিজের মন অনুযায়ী দিন কাটাতে।
প্রথমে কঠিন লাগে। কিন্তু ধীরে ধীরে ভালো লাগতে শুরু করেছে।
আমি বুঝতে পারছি – আমার নিজের একটা ইচ্ছা আছে। একটা পছন্দ আছে। যেটা আমি ভুলে গিয়েছিলাম।
সেদিন বিকেলে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে ভাবলাম – এই মুহূর্তটা কত সুন্দর। কোনো এলার্ম নেই। কোনো নোটিফিকেশন নেই। শুধু আমি আর আমার চা।
এই যে স্বাধীনতা – এটাই manual control.
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি – আমি আমার জীবনের চালক হব। যন্ত্র আমার সহায়ক হবে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক হবে না।
হ্যাপিকে বলেছি – আমরা মাঝে মাঝে unplugged দিন কাটাই। কোনো পরিকল্পনা ছাড়া। কোনো রুটিন ছাড়া।
যা মন চায় তাই করি।
আরাশকে শেখাচ্ছি – নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে। নিজের পছন্দ বলতে।
কারণ জীবন একটা autopilot গাড়ি নয়। এটা একটা সাইকেল। যেটা আমাদের নিজেদের চালাতে হয়।
প্রতিটি প্যাডেল আমাদের নিজেদের মারতে হয়। প্রতিটি মোড় আমাদের নিজেদের নিতে হয়।
তবেই জীবনে আনন্দ আছে। তবেই জীবনে অর্থ আছে।
autopilot সুবিধাজনক। কিন্তু manual control জীবন্ত।
আর আমি জীবন্ত থাকতে চাই।
একটু ভাবনা রেখে যান