ব্লগ

যন্ত্রের ঝাড়ু, হাতের অভাব

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

জামিউরের বাড়িতে গিয়ে দেখি একটা ছোট্ট যন্ত্র মেঝে পরিষ্কার করছে। নিজে নিজেই ঘুরছে। ধুলা চুষে নিচ্ছে।

“রোবট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার,” জামিউর গর্বের সাথে বলল। “এখন আর ঝাড়ু দিতে হয় না।”

আমি দেখলাম। কিন্তু একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।

এই ঘর কি এখনো জামিউরের ঘর? নাকি যন্ত্রের ঘর?

আমি ভাবি – ঘর পরিষ্কার করার মধ্যে কী আছে? শুধু ধুলা সাফ করা? নাকি আরও কিছু?

হ্যাপি প্রতিদিন ঘর পরিষ্কার করে। ঝাড়ু দেয়। মুছে দেয়। আমি দেখি তার মুখে একটা সন্তুষ্টি। একটা গর্ব।

“আজ ঘরটা কত সুন্দর লাগছে,” সে বলে।

এই যে নিজের হাতে ঘর সুন্দর করার আনন্দ – এটা কি রোবট দিতে পারে?

রোবট পরিষ্কার করে। কিন্তু সেই পরিষ্কার করায় কোনো আবেগ নেই। কোনো ভালোবাসা নেই।

হ্যাপি যখন ঘর পরিষ্কার করে, সে শুধু ধুলা সাফ করে না। সে আমাদের জীবনযাত্রা গুছিয়ে দেয়।

আরাশের খেলনা যেখানে সেখানে পড়ে থাকে। হ্যাপি সেগুলো তুলে সাজিয়ে রাখে। প্রতিটা জিনিসের একটা জায়গা আছে। একটা অর্থ আছে।

রোবট কি এই অর্থ বুঝতে পারে?

রোবট দেখে কোথায় ধুলা। কিন্তু দেখে না কোথায় স্মৃতি লুকিয়ে আছে।

আমাদের ঘরের মেঝেতে আরাশের প্রথম হাঁটার চিহ্ন আছে। দেয়ালে তার ছোটবেলার দাগ আছে। এসব রোবট পরিষ্কার করে দিলে আমাদের ইতিহাস মুছে যায়।

হ্যাপি পরিষ্কার করার সময় এইসব মূল্যবান জিনিস বাঁচিয়ে রাখে। কারণ সে জানে কোনটা ধুলা, কোনটা স্মৃতি।

ঘর পরিষ্কার করা শুধু একটা কাজ নয়। এটা একটা যত্ন। একটা ভালোবাসার প্রকাশ।

আমি যখন দেখি হ্যাপি আমাদের ঘর পরিষ্কার করছে, আমি বুঝি সে আমাদের জীবন পরিষ্কার করছে। আমাদের ভবিষ্যত গুছিয়ে দিচ্ছে।

রোবট কি এই ভালোবাসা দিতে পারে?

আরেকটা বিষয় – হ্যাপি পরিষ্কার করার সময় ঘরের প্রতিটা কোণা দেখে। কোথায় কী সমস্যা আছে। কোনটা মেরামত করতে হবে।

এই observation রোবটের নেই। রোবট শুধু নির্দিষ্ট কাজ করে। সমস্যা দেখে না।

ঘর পরিষ্কার করা একটা ব্যক্তিগত কাজ। এতে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ পায়।

হ্যাপি জানে আমি কোথায় বই রাখতে পছন্দ করি। আরাশ কোথায় খেলতে পছন্দ করে। সেই অনুযায়ী সে ঘর সাজায়।

রোবট কি এই ব্যক্তিগত পছন্দ বুঝতে পারে?

আমি লক্ষ করেছি – যেইসব বাড়িতে রোবট দিয়ে ঘর পরিষ্কার হয়, সেইসব ঘর দেখতে হোটেলের মতো লাগে। পরিষ্কার, কিন্তু প্রাণহীন।

আমাদের ঘরে একটু এলোমেলো আছে। কিছু জিনিস ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এই এলোমেলোই আমাদের ঘরকে জীবন্ত করে তোলে।

রোবট সবকিছু গুছিয়ে দেয়। কিন্তু সেই গোছানো ঘরে আমাদের চিহ্ন থাকে না।

ঘর মানে শুধু চার দেয়াল আর ছাদ নয়। ঘর মানে আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিফলন।

যখন আমরা নিজের হাতে ঘর পরিষ্কার করি, আমরা সেই ঘরের সাথে সংযুক্ত হই। ঘরটা আমাদের হয়ে ওঠে।

রোবট পরিষ্কার করলে ঘরটা থাকে। কিন্তু সেটা আর আমাদের ঘর থাকে না। থাকে একটা পরিষ্কার জায়গা।

আমি আরাশকে শেখাই ঘর পরিষ্কার করতে। নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখতে। এটা শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য নয়। এটা দায়িত্ববোধ শেখানোর জন্য।

রোবট থাকলে সে এই দায়িত্ববোধ শিখবে না। ভাববে সবকিছু যন্ত্র করে দেবে।

কিন্তু জীবনে সবকিছু যন্ত্র করে দেয় না। কিছু কিছু কাজ নিজের হাতে করতে হয়।

আর নিজের হাতে কাজ করার মধ্যে একটা সন্তুষ্টি আছে। একটা গর্ব আছে।

“আমি এই ঘর সুন্দর করেছি” – এই কথা বলার আনন্দ রোবটের ব্যবহারকারী পায় না।

তাই আমি মনে করি – রোবট দিয়ে ঘর পরিষ্কার করলে ঘর পরিষ্কার হয়। কিন্তু ঘর আর ঘর থাকে না।

থাকে একটা জায়গা। যেখানে আমরা বাস করি। কিন্তু যেটা আমাদের নয়।

ঘর হতে হলে আমাদের হাতের ছোঁয়া লাগে। আমাদের ভালোবাসা লাগে।

যন্ত্র সেটা দিতে পারে না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *