সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করছিলাম বুঝাতে যে আমার বেতন দুই মাস বাকি। মুখে কথা বলতে গেলে গলা কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছিল। তাই হাত দিয়ে ইশারা করতে শুরু করলাম।
প্রথমে দুটো আঙুল তুলে দেখালাম – দুই মাস। তারপর পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে ইশারা করলাম – টাকা। তারপর হাতের তালু উপরের দিকে করে মাথা নাড়লাম – দরকার।
কিন্তু হঠাৎ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। হাত দুটো যেন জমে গেল। আঙুলগুলো নড়ছে না। হাতের তালুতে একটা ঝিনঝিন অনুভূতি। তারপর ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যেতে লাগল।
আমি হাত নাড়ানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুই হলো না। যেন হাত দুটো আমার শরীরের অংশ নয়, দুটো পাথরের টুকরো ঝুলে আছে।
সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, “হায়দার, তুমি কি বোবা হয়ে গেছ নাকি? কথা বলো।”
কিন্তু আমি কথাও বলতে পারছি না, হাতেও ইশারা করতে পারছি না। দাঁড়িয়ে রইলাম নিথর পাথরের মূর্তির মতো।
অফিস থেকে বেরিয়ে বাসে বসে হাত দুটো দেখলাম। ধীরে ধীরে অনুভূতি ফিরে আসছে। কিন্তু সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতাটা মন থেকে যাচ্ছে না।
ছোটবেলায় বোবা একটা ছেলে ছিল আমাদের পাড়ায়। সে শুধু হাত দিয়ে কথা বলত। তার হাতের ভাষা এত সুন্দর ছিল যে আমরা সবাই বুঝতে পারতাম। হাসি, কান্না, রাগ, খুশি – সব কিছু তার আঙুলের ইশারায় ফুটে উঠত।
একদিন মা বলেছিলেন, “ওর কোনো কষ্ট নেই। ও হাত দিয়ে যা বলে, তা মুখ দিয়ে বলার চেয়ে বেশি সত্য।”
কিন্তু আমার কি হলো? আমার মুখের ভাষা তো আগে থেকেই কেউ বোঝে না। এখন হাতের ভাষাও চলে গেল?
বাসায় ফিরে হ্যাপিকে কিছু বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কথা বলতে গেলে আবার সেই গলা শুকানো অনুভূতি। তাই হাত দিয়ে ইশারা করলাম। কিন্তু আবার সেই অবশতা।
হ্যাপি উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “কি হয়েছে তোমার? ডাক্তার দেখাবে?”
আরাশ এসে আমার হাত ধরল। “বাবা, তোমার হাত এত ঠাণ্ডা কেন?”
তখন বুঝলাম, সমস্যাটা শরীরে নয়। সমস্যাটা আরো গভীরে।
আমি এমন একটা জগতে বাস করি যেখানে আমার কোনো ভাষাই কাজ করে না। মুখের ভাষা কেউ শোনে না। লেখার ভাষা কেউ পড়তে পারে না। এখন হাতের ভাষাও অচল হয়ে গেল।
নাকি এটা আল্লাহর একটা ইশারা? হয়তো আমি অনেকদিন ভুল ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করেছি। হয়তো সত্যিকারের ভাষা একদম আলাদা জায়গায়।
রাতে বিছানায় শুয়ে হাত দুটো তুলে ধরলাম। এই হাত দিয়ে আমি কত কাজ করেছি। চাকরির কাগজ লিখেছি। আরাশকে কোলে তুলেছি। হ্যাপির মাথায় হাত বুলিয়েছি।
কিন্তু এই হাত দিয়ে কি আমি কখনো সত্যিকারের কথা বলতে পেরেছি?
হয়তো অবশ হওয়া মানে মৃত্যু নয়। হয়তো অবশ হওয়া মানে পুরনো ভাষা ছেড়ে দেওয়া। নতুন ভাষা শেখার প্রস্তুতি।
কিন্তু সেই নতুন ভাষাটা কী? আর কোথায়?
একটু ভাবনা রেখে যান