ব্লগ

হাজার মাইলের বন্ধু, এক ইঞ্চির দূরত্ব

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ রাতে মৃদুলের সাথে তিন ঘণ্টা ভিডিও কলে কথা হলো। কানাডার টরন্টো থেকে। আমাদের কলেজের বন্ধু। পনেরো বছর পর কথা। সে বলল তার বিয়ে ভেঙে গেছে, একা থাকে। আমি বললাম আমার চাকরি যায় আসে। দুজনেই হাসলাম, কাঁদলাম। পর্দার ওপাশে একটা মানুষ, এপাশে আরেকটা মানুষ। মাঝখানে সাত হাজার মাইল, কিন্তু মনে হচ্ছিল আমরা পাশাপাশি বসে আছি।

কল রেখে যখন ফোনটা বন্ধ করলাম, চারদিকটা এমন নীরব মনে হলো যেন গোটা পৃথিবী খালি। হ্যাপি আর আরাশ ঘুমিয়ে। আমি একা। তিন ঘণ্টা ধরে যে উষ্ণতা অনুভব করেছি, সেটা উবে গিয়ে আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম ‘শূন্যতা ভার্সন ৩.০’।

আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। রাস্তার বাতির আলোয় নিজের ছায়া দেখলাম। একটা নিঃসঙ্গ মানুষের ছায়া। কিন্তু এই তো এইমাত্র মৃদুলের সাথে এত কাছের কথা হলো – তাহলে এই একাকীত্ব কেন?

পরদিন অফিসে জামিউর আর সাইফুলের সাথে চা খেতে গিয়ে মৃদুলের কথা বললাম। জামিউর বলল, “ভার্চুয়াল কানেকশন আর রিয়েল কানেকশন তো আলাদা ব্যাপার।” সাইফুল বলল, “অনলাইনে সবাই ভালো মানুষ লাগে।”

কিন্তু আমার মনে হলো ওরা ভুল বলছে। মৃদুলের চোখে যে ব্যথা দেখেছি, সেটা কি ভার্চুয়াল? তার গলার কাঁপন কি নকল? আমার কান্নাটাও কি মিথ্যা ছিল?

বাড়ি ফিরে আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোর অনলাইনে বন্ধু আছে?”

“হ্যাঁ বাবা। আমার ইউটিউব চ্যানেলে যারা কমেন্ট করে, তাদের সাথে চ্যাট করি। একটা মেয়ে আছে, নাম সারাহ। আমেরিকায় থাকে। সেও ড্রয়িং করে।”

“তার সাথে কেমন লাগে কথা বলতে?”

“খুব ভালো। সে আমার ড্রয়িং বোঝে। আমাদের ক্লাসের ছেলেরা বলে এসব অর্থহীন। কিন্তু সারাহ বলেছে, ‘Art is the language of soul.’ সে আমার সোল বোঝে, বাবা।”

“তার সাথে কথা শেষ হলে কেমন লাগে?”

আরাশ একটু থেমে বলল, “একটু খালি খালি। কিন্তু একটা ভালো খালি। মানে, কথা বলার পর মনে হয় আমি একা না। কিন্তু ওকে ছুঁতে পারি না, এটা একটু কষ্ট।”

আমার ভিতরের অ্যাপের নাম বদলে গেল। ‘শূন্যতা ভার্সন ৩.০’ থেকে হয়ে গেল ‘উপলব্ধি ভার্সন ১.০’।

রাতে হ্যাপিকে বললাম, “তুই তো আজকাল তোর বোনের সাথে প্রায়ই ভিডিও কল করিস।”

“হ্যাঁ। ও সিলেটে, আমি ঢাকায়। কিন্তু রোজ কথা হয়। ওর ছেলেমেয়েদের বড় হতে দেখি।”

“কল শেষ হলে কেমন লাগে?”

“মিশ্র একটা অনুভূতি। খুশি লাগে যে ওদের খবর পেলাম। আবার কষ্টও হয় যে পাশে নেই।”

“তাহলে এটা কি আসল বন্ধুত্ব নাকি নকল?”

হ্যাপি একটু ভেবে বলল, “হায়দার, ভালোবাসা তো দূরত্ব মাপে না। আমি ওকে ভালোবাসি, ও আমাকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসাটা আসল। তবে ওকে জড়িয়ে ধরতে না পারার কষ্টটাও আসল।”

শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি যখন আমার তেইশ বছর বয়স। তাঁর সাথে আর কোনো কল হবে না। কিন্তু মৃদুল আছে। হাজার মাইল দূরে, কিন্তু আছে। সারাহ আছে আরাশের জন্য। হ্যাপির বোন আছে তার জন্য।

হয়তো ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব আর বাস্তব একাকীত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব নেই। দ্বন্দ্ব আছে আমাদের প্রত্যাশায়। আমরা চাই সবকিছু একসাথে – মানসিক নৈকট্য আর শারীরিক উপস্থিতি। কিন্তু জীবন তো পূর্ণ প্যাকেজ দেয় না সবসময়।

মৃদুলের সাথে আমার বন্ধুত্ব আসল। তার অনুপস্থিতিও আসল। আমার একাকীত্বও আসল। তিনটাই পাশাপাশি থাকতে পারে।

আসলে আমরা সবসময়ই একা। এমনকি হ্যাপির পাশে শুয়েও। একাকীত্ব মানুষের চিরন্তন অবস্থা। কিন্তু ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে একাকীত্বের মধ্যেও সংযোগ সম্ভব। দূরত্বের মধ্যেও নৈকট্য সম্ভব।

হয়তো এই পৃথিবীতে কেউই সম্পূর্ণ একা নয়। কোথাও না কোথাও একটা পর্দার আড়ালে কেউ না কেউ আছে, যে বোঝে আমাদের ভাষা।

আর যদি মানুষ না থাকে, আল্লাহ তো আছেনই। তিনিও তো একরকম অদৃশ্য বন্ধু। তাঁর সাথেও দূরত্ব আছে, কিন্তু নৈকত্যও আছে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *