স্কুলের অভিভাবক সভায় আমি পেছনের বেঞ্চে বসেছি। সামনে বসেছেন অন্য বাবারা—স্যুট-টাই পরা, দামি ঘড়ি পরা, আত্মবিশ্বাসী।
আমি আমার পুরনো শার্ট আর ছেঁড়া জুতা নিয়ে বসে আছি।
প্রধান শিক্ষক বলছেন, “আমাদের স্কুলে ল্যাবরেটরি তৈরি করতে প্রতি ছাত্রের অভিভাবককে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে।”
সামনের বাবারা মাথা নাড়ছেন। একজন বলেন, “এটা তো খুবই যুক্তিসঙ্গত। বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য ল্যাব জরুরি।”
আমার মুখ শুকিয়ে যায়। পাঁচ হাজার টাকা আমার কাছে এক মাসের খরচ।
আরেকজন বাবা বলেন, “আমরা চাইলে আরো দিতে পারি। আমার মনে হয় দশ হাজার করে দিলে আরো ভালো ল্যাব হবে।”
অন্যরা সমর্থন করে। আমি চুপ করে বসে থাকি।
“কেউ কোনো আপত্তি আছে?” প্রধান শিক্ষক জিজ্ঞেস করেন।
আমার আপত্তি আছে। কিন্তু কীভাবে বলব যে আমার পাঁচ হাজার টাকা নেই?
একজন বাবা দাঁড়িয়ে বলেন, “স্যার, আমাদের ছেলেদের জন্য সব রকম সুবিধা দেওয়া উচিত। টাকার কথা ভাববো না।”
সবাই হাততালি দেয়। আমিও হাততালি দিই। কিন্তু ভিতরে ভিতরে জানি, আমি মিথ্যুক।
আমি ভাবি, এই বাবাদের পেশা কী? হয়তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী। তাদের মাসিক আয় আমার বছরের আয়ের চেয়ে বেশি।
আর আমি? আমি একজন অস্থির লেখক। কয়েকদিন পরপর চাকরি বদলাই।
আমার পাশে বসা একজন বাবা ফিসফিস করে বলেন, “আপনি কী করেন?”
“লেখালেখি।” আমি আস্তে বলি।
“ও, সাংবাদিক?”
“না, লেখক।”
তিনি আর কিছু জিজ্ঞেস করেন না। কিন্তু তাঁর মুখে এক ধরনের করুণা দেখি।
সভা শেষে অন্য বাবারা দলবেঁধে বের হন। তাঁদের গাড়ি আছে, ড্রাইভার আছে। আমি রিকশার অপেক্ষা করি।
বাড়িতে ফিরে হ্যাপিকে বলি, “স্কুলে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে।”
হ্যাপির মুখ মলিন হয়ে যায়। “কীসের জন্য?”
“ল্যাবরেটরি।”
“আমাদের কাছে তো এত টাকা নেই।”
“আমি জানি।”
আমরা দুজনেই চুপ হয়ে যাই।
আরাশ জিজ্ঞেস করে, “বাবা, আমাদের স্কুলে নতুন ল্যাব হবে?”
“হ্যাঁ।” আমি মিথ্যা বলি।
কিন্তু আমি জানি, আরাশ সেই ল্যাব ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ তার বাবা একজন গরিব লেখক।
এই রাতে আমি ভাবি—আমি কি আরাশের জন্য ভুল পেশা বেছে নিয়েছি? আমার কি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া উচিত ছিল?
কিন্তু তাহলে আমি আর আমি থাকতাম না।
আমার হীনমন্যতা আর আমার স্বপ্ন—দুটোর মধ্যে আমি পিষ্ট হয়ে যাই।
একটু ভাবনা রেখে যান