ব্যাংক স্টেটমেন্টটা হাতে নিয়ে বসে আছি। সংখ্যাগুলো আমার দিকে তাকিয়ে আছে নির্বিকার দৃষ্টিতে – না বেশি, না কম। মাঝামাঝি। সেই চিরকালীন মাঝামাঝি অবস্থান, যেখানে স্বপ্ন দেখার সাহস থাকে না, আবার হতাশ হওয়ারও কারণ নেই।
“আবার হিসাব কষছ?” হ্যাপি পেছন থেকে দেখছে। “তুমি তো এমনিতেই কোনো কিছুর লোভ কর না।”
লোভ? আমি কি সত্যিই লোভ করি না, নাকি লোভ করার সাহসই হারিয়ে ফেলেছি?
আরাশ স্কুল থেকে এসে বলল, “বাবা, আমার বন্ধু কক্সবাজার গেছে। আমরাও কবে যাব?”
কবে? এই প্রশ্নটা আমার মাথায়ও ঘুরপাক খায়। কবে আমরা করব সেই জিনিসগুলো যেগুলো শুধু টাকার অভাবে করা হয় না?
অফিসে সিয়াম বলছিল, “দোস্ত, জীবনে টাকা জমিয়ে কী করবি? মরার সময় তো আর সাথে নিয়ে যেতে পারবি না। এখনই ঘুরে দেখ দুনিয়া।”
রফিক মাথা নাড়ল, “আরে বাবা, টাকা না থাকলে বুড়ো বয়সে কী খাবি? আগে ভবিষ্যৎ নিরাপদ কর, তারপর মজা।”
দুই বন্ধু, দুই মতামত। আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবি – কোনটা ঠিক?
রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবি – আমার জীবনে কোনো অ্যাডভেঞ্চার আছে কি? নাকি আমি এক রুটিন মেশিনের মতো চলি – ঘর থেকে অফিস, অফিস থেকে ঘর?
ফেসবুকে বন্ধুদের ছবি দেখি। কেউ থাইল্যান্ড গেছে, কেউ সিলেট, কেউ নতুন বাইক কিনেছে। তাদের হাসিমুখ দেখে মনে হয় – তারা জানে কীভাবে বাঁচতে হয়, আমি শুধু টিকে থাকি।
“তুমি একটু আরাম-প্রিয় টাইপের,” হ্যাপি মাঝে মাঝে বলে। “কিছু করার কথা বললেই তুমি খরচের হিসাব কর।”
আরাম-প্রিয়? নাকি ভীরু? আমি কি সত্যিই আরাম চাই, নাকি রিস্ক নিতে ভয় পাই?
আজ দুপুরে লিফটে ওঠার সময় দেখলাম নতুন একজন কলিগ। ব্র্যান্ডের জামা, দামি ঘড়ি। কিন্তু চোখে এক ধরনের ক্লান্তি। সে বলল, “ভাই, অনেক কামাই করেছি। কিন্তু জীবন উপভোগ করার সময় পাই না।”
আমি ভাবলাম – তার সমস্যা অন্যরকম। আমার সমস্যা উল্টো।
এক কাপ চা খেতে খেতে হিসাব করি – যদি মাসে পাঁচ হাজার টাকা বেশি খরচ করি অভিজ্ঞতার পেছনে, তাহলে বছরে ষাট হাজার। দশ বছরে ছয় লাখ। এই ছয় লাখ টাকা দিয়ে আরাশের ভবিষ্যৎ আরো নিরাপদ করতে পারি।
কিন্তু তারপর আরেকটা চিন্তা আসে – আরাশ যখন বড় হবে, সে কি তার বাবাকে নিয়ে গর্ব করবে? “আমার বাবা অনেক টাকা জমিয়েছিল”, নাকি “আমার বাবা জীবন উপভোগ করতে জানতেন”?
গত সপ্তাহে কক্সবাজার যাওয়ার একটা প্ল্যান করেছিলাম। বাজেট করে দেখলাম পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা লাগবে। তারপর ভাবলাম – এই টাকা দিয়ে আরাশের টিউশনি দিতে পারি তিন মাস।
প্ল্যান বাতিল।
কিন্তু সেদিন রাতে আরাশ ঘুমের মধ্যে বলেছিল, “বাবা, সমুদ্র কেমন দেখতে?”
আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ভেবেছিলাম – সমুদ্র দেখতে কেমন? আমিও তো দেখিনি কখনো।
পরদিন অফিসে নাহিদ ভাই বলছিলেন, “আমার ব্যাংকে তিন লাখ টাকা আছে। কিন্তু গত রাতে হার্ট অ্যাটাক হতে হতে বেঁচেছি। এখন বুঝেছি, টাকা জমিয়ে কী লাভ?”
আমি চুপ করে শুনলাম। তারপর ভাবলাম – নাহিদ ভাইয়ের তিন লাখ, আমার কত আছে?
সন্ধ্যায় পার্কে বসে আছি আরাশের সাথে। সে খেলছে, আমি দেখছি। হঠাৎ মনে হল – এই মুহূর্তটাও তো একটা অভিজ্ঞতা। টাকা খরচ না করেই।
আরাশ দৌড়ে এসে বলল, “বাবা, এই পার্কটা কত সুন্দর!”
আমি হাসলাম। হয়তো অভিজ্ঞতা মানেই শুধু টাকা খরচ করা নয়। হয়তো অভিজ্ঞতা মানে মুহূর্তগুলোকে অনুভব করা।
কিন্তু তারপরই মনে পড়ল – সমুদ্র দেখতে তো টাকাই লাগবে।
এই টানাপোড়েনে আছি রোজ। এক পকেটে আছে নিরাপত্তার চাহিদা, আরেক পকেটে আছে বাঁচার ইচ্ছা। দুটোর মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?
রাতে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি খুশি আমাদের জীবন নিয়ে?”
“হুম,” আমি উত্তর দিলাম।
কিন্তু মনে মনে ভাবলাম – খুশি নাকি অভ্যস্ত?
আয়নায় নিজেকে দেখি। সাতত্রিশ বছর বয়সী এক মানুষ, যে এখনও বুঝতে পারেনি – জীবনটা হিসাবের খাতা, নাকি অভিজ্ঞতার গল্প?
একটু ভাবনা রেখে যান