
কাগজটা হাতে নাও।
ছোট কাগজ। সাদা। কয়েকটা সংখ্যা।
ব্যালেন্স: ০.০০
শূন্য।
এই আর্থিক সংকট নতুন না। কিন্তু প্রতিবার নতুন মনে হয়।
হাত কাঁপে কিনা দেখো।
এই অ্যাকাউন্টে কিছুদিন আগে পাঁচ হাজার টাকা ছিল।
বইয়ে দুই হাজার। ওষুধে দেড় হাজার। মেরামতে পনেরোশ।
শেষ।
পাঁচ হাজার টাকা শেষ হতে কতক্ষণ লাগে? এক সপ্তাহ। হয়তো দুই সপ্তাহ। বেঁচে থাকার লড়াই।
সঞ্চয় ও ব্যয় — এই দুটো শব্দ পাশাপাশি বসলে হাসি পায়। সঞ্চয় কোথায়? শুধু ব্যয়।
এটাকে অপচয় বলে না। এটাকে বলে বেঁচে থাকা।
তবু শূন্য দেখলে মনে হয় ব্যর্থ হয়েছি।
কেন মনে হয়?
কারণ কোথাও একটা সংখ্যা আছে। লেখা আছে। কোনো বইয়ে, কোনো পরামর্শে।
“পঞ্চাশ বছর বয়সে বার্ষিক আয়ের দশ গুণ জমানো উচিত।”
বার্ধক্যের প্রস্তুতি নাকি এভাবে হয়। সংখ্যা দিয়ে।
বছরে চার লাখ আয় মানে চল্লিশ লাখ জমা থাকা উচিত।
আছে শূন্য।
ফারাকটা মাথায় ঢোকে না। চল্লিশ লাখ থেকে শূন্য — এই দূরত্বের কোনো ভাষা নেই।
পাশের বাড়ির মানুষটা বলেছিল, “দশ লাখ জমিয়েছি।”
সে কি আলাদা কিছু করেছে?
হয়তো। হয়তো না।
মধ্যবিত্ত জীবন এমনই। পাশাপাশি বাড়ি, কিন্তু ভাগ্য আলাদা।
হয়তো তার বাবার জমি ছিল। হয়তো সংসারে অসুখ আসেনি। হয়তো তাকে কাউকে বইয়ের টাকা দিতে হয়নি।
হয়তো শুধু ভাগ্য।
কিন্তু তুলনাটা মাথা থেকে যায় না। তার দশ লাখ। আমার শূন্য পকেট।
এই তুলনা মানুষকে ভেতর থেকে ছোট করে।
সত্যি কথা হলো এই —
টাকা জমানোর পরামর্শ যারা দেয়, তারা কখনো জিজ্ঞেস করে না — মাস শেষে কত বাকি থাকে।
হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সব উপায়ই ধরে নেয় তোমার হাতে কিছু আছে। কিছু না থাকলে উপায়ও নেই।
“প্রতি মাসে আয়ের বিশ ভাগ জমাও।”
কিন্তু যার মাস শেষে শূন্য থাকে, সে কোথা থেকে বিশ ভাগ জমাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনো পরামর্শে নেই।
শূন্য মানে শুধু সংখ্যা না।
শূন্য মানে একটা ভয়।
ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নামে যে জিনিসটা পত্রিকায় লেখে, সেটা এখানে নেই।
যদি অসুখ হয়? যদি দুর্ঘটনা হয়? যদি হঠাৎ কিছু দরকার হয়?
জীবনের বাস্তবতা হলো এই “যদি”গুলো শুধু প্রশ্ন না। এগুলো ভবিষ্যৎ।
এই “যদি”গুলো রাতে আসে। ঘুমের ভেতরে ঢোকে। মানুষ ঘুরে ঘুরে শোয়।
ভোর চারটায় উঠে ছাদে যায়।
আকাশ দেখে।
আকাশের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর নেই। কিন্তু আকাশের দিকে তাকানো ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার নেই।
সমাজ বলে সঞ্চয় মানে নিরাপত্তা।
মিথ্যা কথা না।
কিন্তু আংশিক সত্য।
পুরো সত্য হলো — এই পৃথিবীতে এমন কোটি কোটি মানুষ আছে, যারা কখনো জমাতে পারেনি। তাদের সংসার চলেছে। ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। বাবা-মা মারা গেছে।
জমানো ছাড়াও জীবন হয়।
কিন্তু জমানো না থাকলে একটা ভয় সারাক্ষণ পাশে থাকে। সেই ভয়টা সত্যি।
সবচেয়ে নির্মম প্রশ্নটা কী?
“আমার পর কী হবে?”
এই প্রশ্ন সব বাবা জিজ্ঞেস করে। সব মা জিজ্ঞেস করে।
পারিবারিক দায়িত্ব শুধু আজকের না। আগামীকালেরও। কিন্তু হাতে কিছু না থাকলে আগামীকাল একটা কালো গর্ত।
শূন্য ব্যালেন্স থাকলে এই প্রশ্নটা আরো বেশি কাঁটার মতো বিঁধে।
“আমি কি কিছু রেখে যেতে পারব?”
হয়তো না।
হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় এখানে শুধু একটা — মেনে নেওয়া। কিন্তু মেনে নেওয়াটাও একটা উপায় কিনা, সেটা নিশ্চিত না।
এই “হয়তো না” সামলানো শেখা যায় না। মেনে নেওয়া যায় না। শুধু বহন করা যায়।
কিন্তু একটা কথা আছে।
কাগজটা দেখো আবার।
ব্যালেন্স: ০.০০
এই শূন্য মানে তুমি সব খরচ করেছ বেঁচে থাকার জন্য।
বইয়ে। ওষুধে। মেরামতে।
শূন্য মানে তুমি থামোনি।
কিন্তু এই কথাটা সান্ত্বনা না।
সান্ত্বনা এখানে মিথ্যা হবে।
মানসিক প্রশান্তি খুঁজতে যারা বলে “টাকা সব না”, তারা ঠিক বলে। কিন্তু টাকা না থাকার যন্ত্রণাটা তারা বোঝে না।
সত্য হলো, শূন্য ব্যালেন্স ভয়ের। শূন্য ব্যালেন্স কষ্টের। শূন্য ব্যালেন্স মানে রাতে ঘুম কম।
এই কষ্টকে “শিক্ষা” বলা ঠিক না।
এই ভয়কে “শক্তি” বলা ঠিক না।
এটা শুধু কষ্ট।
এবং এই পৃথিবীতে অনেক মানুষ এই কষ্ট একা বহন করে।
নিঃশব্দে।
ATM থেকে বের হও।
রাস্তায় নামো।
চারপাশে মানুষ। সবাই কোথাও যাচ্ছে।
কতজনের পকেটে এই মুহূর্তে কত টাকা আছে — কেউ জানে না।
কেউ বলে না।
শুধু হাঁটে।
তুমিও হাঁটো।
কাগজটা পকেটে রাখো।
শূন্য। সম্পূর্ণ শূন্য।
হয়তো আগামীকাল বদলাবে। হয়তো না।

একটু ভাবনা রেখে যান