হ্যাপি আজ বলল, “আমি চাকরি করতে চাই।”
কথাটা আমার বুকে বাজল। একদিকে আমি খুশি হলাম—আমাদের আর্থিক চাপ কমবে। অন্যদিকে একটা অস্বস্তি হলো—সমাজ কী বলবে?
আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম।
হ্যাপি গ্র্যাজুয়েট। মেধাবী। বিয়ের আগে ও পড়াশোনা করেছে চাকরি করার স্বপ্ন নিয়ে।
কিন্তু বিয়ের পর সেই স্বপ্ন চাপা পড়ে গেছে। আরাশের জন্ম হওয়ার পর একেবারেই ভুলে গেছে।
এখন আরাশ এগারো বছর। স্কুলে যায়। হ্যাপির হাতে সময় আছে।
হ্যাপি বলল, “আমি ঘরে বসে থেকে বিরক্ত হই। আমার মনে হয় আমি অকেজো।”
আমি বললাম, “তুমি অকেজো নও। তুমি ঘর সামলাও। আরাশের দেখভাল করো।”
হ্যাপি বলল, “এসব তো কাজের মধ্যে পড়ে না। চাকরি করলে আমার একটা পরিচয় থাকবে।”
আমি বুঝলাম, হ্যাপির কাছে চাকরি শুধু টাকার ব্যাপার নয়। এটা তার স্বতন্ত্র পরিচয়ের ব্যাপার।
কিন্তু আমার মনে নানা প্রশ্ন। আমাদের সমাজে স্ত্রীর চাকরি করা নিয়ে কী ধারণা?
আমার মা জীবিত থাকলে কী বলতেন? তিনি কখনো চাকরি করেননি। সারাজীবন ঘর সামলেছেন।
আমার ভাই কী বলবে? সে তার স্ত্রীকে চাকরি করতে দেয় না।
এলাকার লোকেরা কী বলবে? তারা কি ভাববে আমি আমার স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল?
এই চিন্তাগুলো আমাকে দ্বিধায় ফেলে দেয়।
আমি হ্যাপিকে বললাম, “আমি ভেবে দেখি।”
হ্যাপি কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখে হতাশা দেখলাম।
আমি রাতে ভাবলাম। আমার কী সমস্যা? হ্যাপি চাকরি করলে তো ভালোই। আমাদের আর্থিক অবস্থা উন্নতি হবে। আরাশের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারব।
কিন্তু আমার পুরুষালি অহংকার বাধা দিচ্ছে। আমি মনে করি পরিবার চালানোর দায়িত্ব আমার। আমি চাই লোকে জানুক আমি একাই আমার পরিবার চালাতে পারি।
কিন্তু আমি পারছি তো? প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছি। ক্লান্ত হয়ে পড়ছি।
আমি ভাবলাম, আমার অহংকার আর হ্যাপির স্বাধীনতা—কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
পরদিন আমি হ্যাপিকে বললাম, “তুমি চাকরি খোঁজো। আমি সাপোর্ট করব।”
হ্যাপির মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। “সত্যি?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। কিন্তু একটা শর্ত।”
হ্যাপি ভয় পেয়ে বলল, “কী শর্ত?”
আমি বললাম, “আরাশের যত্ন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”
হ্যাপি বলল, “সেটা তো আমার প্রথম দায়িত্ব।”
হ্যাপি চাকরি খোঁজা শুরু করল। কিন্তু বাধা এল অন্য দিক থেকে।
এলাকার লোকেরা বলতে শুরু করল, “হায়দার এখন স্ত্রীর ওপর নির্ভর করে।”
আমার ভাবি বলল, “দিদি এত দিন ঘরে ছিল। এখন চাকরি করবে কেন?”
এমনকি হ্যাপির বাবাও বললেন, “মেয়ের চাকরি করার দরকার কী? জামাই তো উপার্জন করে।”
এসব কথা শুনে আমি আবার দ্বিধায় পড়লাম।
কিন্তু হ্যাপি বলল, “আমি মানুষের কথায় কান দেব না। আমি চাকরি করব।”
আমি হ্যাপির দৃঢ়তা দেখে অবাক হলাম। আমি যেখানে সমাজের চাপে দোলাচ্ছি, হ্যাপি সেখানে স্থির।
হ্যাপি একটা স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেল। বেতন কম, কিন্তু শুরু।
প্রথম দিন চাকরিতে যাওয়ার সময় হ্যাপির মুখে যে আনন্দ দেখলাম, সেটা আমি আগে দেখিনি।
আমি বুঝলাম, চাকরি হ্যাপির কাছে শুধু আয়ের মাধ্যম নয়। এটা তার আত্মবিশ্বাস, তার পরিচয়।
হ্যাপি চাকরি করার পর আমাদের ঘরের পরিবেশ বদলে গেল। হ্যাপি আগের চেয়ে বেশি উৎসাহী। বেশি কথা বলে।
আমাদের আর্থিক অবস্থাও উন্নতি হলো। আমার চাপ কমল।
কিন্তু সমাজের নানা মন্তব্য এখনো আসে। কেউ কেউ বলে, “হায়দার এখন অলস হয়ে গেছে। স্ত্রী কামাই করে।”
এসব কথা শুনে মন খারাপ হয়। কিন্তু আমি বুঝেছি, সমাজের কথা শুনে চললে কিছুই করা যায় না।
হ্যাপি খুশি। আমার চাপ কমেছে। আরাশেরও কোনো সমস্যা হয়নি। তাহলে সমাজের কথায় কান দেওয়ার মানে কী?
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি হ্যাপির পাশে থাকব। ওর স্বপ্নকে সাপোর্ট করব।
কারণ একটা সুখী স্ত্রী মানে একটা সুখী সংসার। আর সুখী সংসারের চেয়ে বড় কোনো সাফল্য নেই।
একটু ভাবনা রেখে যান