
ফিরে আসা
যে গ্রামে ফিরেছে, সে আর সেই ছেলে না। সেই ছেলে অনেক আগেই মরে গেছে।
টাই
একদিন সকালে টাই বাঁধতে গিয়ে হাত থেমে গেল।
আর পারলাম না।
সেদিনই চাকরি ছেড়ে দিলাম।
প্রথম রাত
গ্রামে ফিরলাম।
প্রথম রাতে বাথরুমে আয়নায় তাকালাম।
একটা মুখ।
চেনা। কিন্তু চোখ অচেনা।
মনে হলো ভেতরে কেউ বসে আছে। তাকে চিনি না।
কেউ বলল — তুই কেমন যেন হয়ে গেছিস।
কেমন?
জানি না। কেমন যেন।
আমগাছ
বাড়ির পেছনে আমগাছ।
ছোটবেলায় মগডাল পর্যন্ত চড়তাম।
এখন তাকাই।
একটা ডালেও চড়ার ইচ্ছে নেই।
জামা নোংরা হবে। হাত ছিলে যাবে।
সেই ছেলেটা কোথায় গেল?
পুরনো ছবি
অ্যালবাম খুললাম।
সাত-আট বছর বয়স। গায়ে কাদা। হাসছে।
এই ছেলেকে চিনি না।
এত খোলামেলা হাসতে পারতাম?
কেউ বলল — তুই একেবারে পালটে গেছিস। আগে এত চুপচাপ ছিলি না। এখন দেখে মনে হয় কোনো অফিসার এসেছে।
হাসলাম।
কিন্তু হাসিটা জোর করে বের করতে হলো।
ভুলে যাওয়া ভাষা
এখানকার মানুষের সাথে কথা বলতে অস্বস্তি লাগে।
তারা যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষা ভুলে গেছি।
শহরে অন্য ভাষা শিখেছি।
এখানে “মুই” বলে, “তুই” বলে।
জিভ আটকে যায়।
পুরনো ডায়েরি
একটা পুরনো ডায়েরি পেলাম।
প্রথম চাকরির বছর।
লেখা আছে — “আজ প্রথম দিন। বুকটা ধুকপুক করছে। মনে হচ্ছে জীবন শুরু হলো।”
এই উৎসাহ আমার ছিল?
হাতের লেখা দেখে নিশ্চিত হলাম। আমারই।
কিন্তু যে এটা লিখেছিল, তাকে চিনি না।
আরেক পাতায় একটা নাম।
মুছে দিয়েছি।
সেই অনুভূতি মনে করতে পারি না।
কিছুই অনুভব হয় না।
শুধু একটা ঝাপসা ছবি।
পুকুরপাড়
গতকাল পুকুরপাড়ে বসেছিলাম।
ছোটবেলায় এই পুকুরে ঝাপাঝাপি করতাম।
এখন পানিতে নামার কথা ভাবলে গা ঘিনঘিন করে।
একটা ছেলে এল। দশ-এগারো বছর। ঝাঁপ দিল। ভেসে উঠে হাসল। আবার ডুব।
আমি তাকিয়ে রইলাম।
সেই ছেলেটা আমি ছিলাম।
কোথায় গেল সে?
হয়তো মরে গেছে।
প্রতিটা ছেলে একসময় মরে যায়।
সিরিজ
তুমি যাকে “আমি” বলো — সে একজন না।
সে অনেকগুলো মানুষের একটা সিরিজ।
পাঁচ বছরের তুমি মরে গেছে।
দশ বছরের তুমি মরে গেছে।
বিশ বছরের তুমি মরে গেছে।
প্রতিবার একটা মৃত্যু। প্রতিবার একটা জন্ম।
কিন্তু কেউ শোক করে না।
কারণ কেউ জানে না যে মৃত্যু হয়েছে।
মিথ্যে স্মৃতি
কেউ বলল — তোর ছোটবেলার কথা মনে আছে? তুই কত দুষ্ট ছিলি।
মনে আছে।
মিথ্যা বললাম।
শুধু কিছু ছবি আছে। কিছু গল্প আছে যা অন্যরা বলেছে।
তুমি অতীত মনে রাখো না।
তুমি মনে রাখো গল্প।
আর প্রতিবার বলার সময় সেই গল্প একটু বদলে যায়।
ছাদ
কেউ বলল — তুই একবার ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলি। মনে আছে?
হ্যাঁ।
মিথ্যা।
সন্ধ্যায় ছাদে গেলাম। নিচে তাকালাম।
এখান থেকে লাফ দিয়েছিলাম?
সেই ছেলে কতটা সাহসী ছিল।
নাকি বোকা।
হয়তো দুটোই।
কে ফিরেছে
পরিবার বলছে — তুই ফিরেছিস।
কিন্তু তারা জানে না।
যে ফিরেছে, সে তাদের ছেলে না।
তাদের ছেলে মরে গেছে।
এখন যে এসেছে, সে অচেনা মানুষ।
একই মুখ পরে আছে।
কিন্তু ভেতরে অন্য কেউ।
তারা
আকাশে তারা।
ছোটবেলায় তারা গুনতাম।
এখন গুনতে ইচ্ছে করে না।
শুধু তাকিয়ে থাকি।
প্রতিদিন একটু একটু করে মরছি।
প্রতিদিন একটু একটু করে জন্মাচ্ছি।
এই মরা-জন্মার মাঝখানে একটা নাম ভেসে বেড়াচ্ছে।
সেই নামটাই “আমি”।
বাকি সব পরিবর্তন।

একটু ভাবনা রেখে যান