হ্যাপি আজ সারাদিন চুপ। কিন্তু এই চুপচাপ সাধারণ নীরবতা নয়। এটা ভিন্ন কিছু। এর মধ্যে একটা ভাষা আছে যা আমি পড়তে শিখিনি।
নারীদের নীরবতা পুরুষদের কথার চেয়ে বেশি বলে।
সকালে চা বানাতে গিয়ে হ্যাপি চিনির পাত্র জোরে রেখেছে। সামান্য একটা শব্দ, কিন্তু সেই শব্দে অনেক কথা। আমি বুঝিনি তখন।
দুপুরে খাবার পরিবেশন করার সময় ও একটুও হাসেনি। আমি জিজ্ঞেস করেছি, “কিছু হয়েছে?” ও বলেছে, “না।” কিন্তু সেই “না” এর পেছনে একটা “হ্যাঁ” লুকানো ছিল।
বিকেলে আমি যখন কাগজ পড়ছিলাম, হ্যাপি বারান্দায় গাছে পানি দিচ্ছিল। আমি দেখেছি ও একটা গাছে অনেকক্ষণ ধরে পানি দিচ্ছে। যেন ও গাছটার সাথে কথা বলছে যা আমার সাথে বলতে পারছে না।
নারীদের কষ্ট পুরুষদের চেয়ে ভিন্ন। আমাদের কষ্ট বাইরে প্রকাশ পায়। তাদের কষ্ট ভেতরে পুষে রাখা হয়।
হ্যাপি কখনো অভিযোগ করে না। আমাদের আর্থিক সমস্যা নিয়ে, আমার কাজের অস্থিরতা নিয়ে, আমার মেজাজের ওঠানামা নিয়ে। কিন্তু এই না-বলাটাই তার কষ্টের প্রকাশ।
আমি যখন চাকরি হারাই, হ্যাপি বলে, “কোনো সমস্যা নেই। আমরা ম্যানেজ করব।” কিন্তু তার চোখে আমি দেখি একটা উদ্বেগ। সেই উদ্বেগের কথা ও বলে না কারণ ও জানে আমি ইতিমধ্যে যথেষ্ট কষ্টে আছি।
নারীরা তাদের নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখে পরিবারের অন্যদের কষ্ট বাড়ানোর ভয়ে।
মাঝে মাঝে হ্যাপি ফোনে ওর মাকে ফোন করে। আমি শুনি ও হাসিখুশি গলায় কথা বলছে, বলছে “আমরা ভালো আছি।” কিন্তু ফোন রাখার পর ওর মুখে একটা বিষণ্ণতা নেমে আসে।
আমি বুঝি, ও মাকে বলতে পারে না আসল কথা। বলতে পারে না যে আমি কতটা অস্থির, আমাদের ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত।
হ্যাপির স্বপ্ন ছিল ঘর সাজানোর। কিন্তু আমাদের আর্থিক অবস্থায় সেটা সম্ভব হয় না। ও কখনো বলে না, কিন্তু আমি জানি ও কষ্ট পায়। অন্যদের সাজানো ঘর দেখে ও যে আক্ষেপ করে, সেটা ওর চোখেই লেখা থাকে।
একদিন আমি দেখি হ্যাপি একটা ম্যাগাজিনে ঘর সাজানোর ছবি দেখছে। আমি ওর পাশে গিয়ে বসি। ও তাড়াতাড়ি ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে দেয়। যেন স্বপ্ন দেখা একটা অপরাধ।
নারীদের কষ্টের আরেকটা দিক হলো তাদের নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলা। হ্যাপি বিয়ের পর হয়ে গেছে “হায়দারের স্ত্রী”, “আরাশের মা”। কিন্তু “হ্যাপি” নামের যে মেয়েটা ছিল, তার স্বপ্ন ছিল, ইচ্ছা ছিল, সেই মেয়েটা হারিয়ে গেছে।
আমি মাঝে মাঝে হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করি, “তুমি কী করতে চাও?” ও বলে, “তোমরা ভালো থাকো, এটাই চাই।” কিন্তু এই উত্তর আসলে উত্তর নয়। এটা একটা পরিত্যাগ।
হ্যাপি ওর নিজের জন্য কিছু চাওয়াটাকে স্বার্থপরতা মনে করে। এই মানসিকতা আমাদের সমাজ নারীদের মধ্যে তৈরি করেছে।
আজ রাতে হ্যাপি ঘুমানোর আগে আয়নায় নিজেকে দেখছিল। আমি লক্ষ করি ওর চোখে একটা প্রশ্ন। যেন ও নিজেকে জিজ্ঞেস করছে, “আমি কে?”
আমি বুঝি, হ্যাপির নীরবতার পেছনে কত প্রশ্ন, কত অপূর্ণতা, কত দমে যাওয়া ইচ্ছা লুকানো আছে।
কিন্তু আমি কীভাবে ওকে বলব যে ও কথা বলতে পারে? কীভাবে বলব যে ওর কষ্টের কথা শোনার জন্য আমি আছি?
নীরবতা ভাঙতে হলে প্রথমে বিশ্বাস তৈরি করতে হয়। বিশ্বাস যে কথা বলা নিরাপদ, কষ্টের কথা বলা দুর্বলতা নয়।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি হ্যাপির কথা শুনব। শুধু সমাধান দেওয়ার জন্য নয়, বোঝার জন্য। আমি ওকে জায়গা দেব নিজের কষ্টের কথা বলার।
কারণ নীরবতা যতই গভীর হোক, ভালোবাসা সেই নীরবতা ভাঙতে পারে।
একটু ভাবনা রেখে যান