ব্লগ

যে নিঃশব্দতা একা করে দেয়

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল রাতে বারান্দায় একা বসেছিলাম। আকাশে তারা দেখছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, এই মুহূর্তটা কারো সাথে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করছে। ভেতরে একটা অদ্ভুত আবেগ কাজ করছিল – আনন্দ নাকি দুঃখ বুঝতে পারছিলাম না।

হ্যাপিকে ডাকতে ইচ্ছে করল। কিন্তু কী বলব? “হ্যাপি, এসো, তারা দেখো?” সে আসবে, দু’মিনিট দাঁড়াবে, তারপর বলবে, “ঠাণ্ডা লাগছে, ভেতরে চলো।”

আরাশকে ডাকি? কিন্তু তার কাছে কীভাবে বলব যে আমার মন এখন কেমন একটা অবস্থায় আছে? যে আমার ভেতরে এমন কিছু অনুভূতি আছে যার কোনো নাম জানি না?

তাই একা বসে রইলাম।

এই ব্যাপারটা আমার সাথে সব সময় হয়। ভেতরে কিছু একটা অনুভব করি, কিন্তু সেটা প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পাই না। আর না পারার কারণে একটু একটু করে সবার থেকে দূরে চলে যাই।

ছোটবেলায় একবার খুব অসুস্থ হয়েছিলাম। জ্বরে বিছানায় পড়ে ছিলাম। মা এসে কপালে হাত দিয়েছিলেন। সেই স্পর্শে এমন একটা অনুভূতি হয়েছিল যে কান্না পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই অনুভূতিটা কী ছিল? কৃতজ্ঞতা? ভালোবাসা? নির্ভরতা? নাকি অন্য কিছু?

মাকে বলতে পারিনি। শুধু কেঁদেছিলাম।

মা ভেবেছিলেন জ্বরের জন্য কান্না। কিন্তু আসলে সেটা ছিল অব্যক্ত আবেগের কান্না।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই সমস্যা আরো বেড়েছে। অফিসে যখন কোনো সহকর্মী ভালো একটা কাজ করে, মন চায় প্রশংসা করি। কিন্তু কীভাবে? “ভালো করেছো” – এই সাধারণ কথাটা বললেই কি আমার মনের গভীর অনুমোদনটা প্রকাশ হবে?

ফলে চুপ থাকি।

হ্যাপির সাথেও তাই। সে যখন রান্না করে, আমার মন ভালো লাগে। কিন্তু শুধু “খাবার ভালো হয়েছে” বললে কি সেই ভালো লাগাটা বোঝানো যায়? তার পরিশ্রমের প্রতি কৃতজ্ঞতা, তার যত্নের প্রতি সম্মান, তার ভালোবাসার প্রতি উত্তর – এসব কীভাবে একটা বাক্যে বলব?

তাই বেশিরভাগ সময় চুপ থাকি।

আরাশ যখন স্কুল থেকে ভালো ফল নিয়ে আসে, আমার গর্ব হয়। কিন্তু সেই গর্বের সাথে মিশে থাকে আরো অনেক কিছু – ভবিষ্যতের আশা, তার সাফল্যের স্বপ্ন, নিজের শৈশবের অতৃপ্তির একটা পূরণ। এসব কীভাবে প্রকাশ করব?

ফলে শুধু বলি, “ভালো।”

কিন্তু “ভালো” কি যথেষ্ট? আরাশ কি বুঝতে পারে তার বাবা আসলে কত খুশি?

এই না পারাগুলো জমতে জমতে আমাকে একা করে ফেলেছে। আমার চারপাশে মানুষ আছে – হ্যাপি, আরাশ, অফিসের সহকর্মীরা। কিন্তু আমার ভেতরের মানুষটা একা।

রাতে শুয়ে থাকি আর ভাবি, অন্যরা কি এমন? তাদের মনের ভাব কি ঠিকমতো প্রকাশ হয়? নাকি সবাই আমার মতো অব্যক্ত আবেগ বুকে নিয়ে একা একা বাঁচে?

আল্লাহ, আমাকে কেন এমন বানিয়েছেন যে অনুভব করতে পারি কিন্তু প্রকাশ করতে পারি না? এই যে অসংখ্য অব্যক্ত ভালোবাসা, অকথিত কৃতজ্ঞতা, অনুচ্চারিত স্বপ্ন বুকে জমে আছে – এগুলোর কি কোনো মূল্য আছে যদি কেউ জানতেই না পারে?

হয়তো এটাই সবচেয়ে কষ্টের একাকীত্ব – মানুষের ভিড়েও একা থাকা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *