ব্লগ

মোবাইলের জাদুকরী নিরবতা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আমাদের বাড়িতে হ্যাপির বোনের ছেলে এসেছে। পাঁচ বছরের রিফাত। সারাক্ষণ দৌড়াদৌড়ি, চিৎকার, কান্নাকাটি। একটা মুহূর্তও শান্ত থাকে না। আমি অফিসের কাজ নিয়ে বসেছি। কিন্তু রিফাতের আওয়াজে মনোযোগ দিতে পারছি না।

হ্যাপি বিরক্ত হয়ে বলল, “একটা কিছু করতে হবে। নাহলে আর পারব না।” আমি বললাম, “মোবাইল দে। ইউটিউবে কার্টুন চালিয়ে দে।” এবং যেন জাদু। রিফাত মোবাইল হাতে পেয়ে একদম চুপ হয়ে গেল।

এই যুগে মোবাইল শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় বিনোদনের মাধ্যম। কার্টুন, গেমস, গান – সব কিছু এক জায়গায়। একটা পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনে তাদের জন্য পুরো পৃথিবী।

রিফাত একটানা দুই ঘণ্টা মোবাইলে কার্টুন দেখল। এই দুই ঘণ্টা বাড়িতে পিনড্রপ নীরবতা। আমি কাজ করতে পারলাম। হ্যাপি রান্না করতে পারল। সবাই স্বস্তিতে।

কিন্তু এই স্বস্তির সাথে সাথে একটা অপরাধবোধও এল। “আমরা কি ঠিক করছি? এত ছোট বাচ্চাকে মোবাইল দিয়ে দিচ্ছি?” এই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল।

আরাশের ছোটবেলায় এরকম ছিল না। তখন মোবাইলে এত সুবিধা ছিল না। ইউটিউব ছিল না। তাই আরাশ খেলাধুলা করত, বই পড়ত, আমাদের সাথে গল্প করত।

এখনকার বাচ্চারা ভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা? তাদের হাতের নাগালে অসীম বিনোদন। কিন্তু তারা কি আমাদের মতো শৈশবের সাদামাটা আনন্দ পাচ্ছে?

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “আমরা কি সহজ সমাধানের দিকে যাচ্ছি? বাচ্চাদের সাথে সময় না দিয়ে মোবাইল দিয়ে শান্ত রাখছি?”

কিন্তু বাস্তবতা হল, মোবাইল ছাড়া এখন চলে না। রিফাত যদি কান্নাকাটি করত, তাহলে কী করতাম? জোর করে চুপ করানোর চেষ্টা করতাম? নাকি তার সাথে খেলতাম?

সমস্যা হল, আমাদের সময় নেই। আগের যুগে মা-বাবা, দাদা-দাদি সবাই বাড়িতে থাকতেন। বাচ্চাদের সঙ্গ দেওয়ার মানুষ ছিল। এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। সবাই ব্যস্ত।

রিফাত তিন ঘণ্টা মোবাইল দেখার পর চোখ লাল হয়ে গেছে। আমি বললাম, “আর না। এত দেখলে চোখের ক্ষতি হবে।” সে মোবাইল ফেরত না দিয়ে কান্না শুরু করল।

এখানেই সমস্যা। মোবাইল একবার দিলে ছাড়তে চায় না। যেন নেশার মতো। আমরা ভাবি সাময়িক সমাধান দিচ্ছি, কিন্তু আসলে একটা বড় সমস্যা তৈরি করছি।

হ্যাপির বোন এসে বলল, “রিফাত বাড়িতেও সারাদিন মোবাইল চায়। না দিলে খাবার খায় না।” শুনে বুঝলাম আমরা একা নই যারা এই সমস্যায় পড়েছি।

আরাশ বলল, “আব্বু, আমার ছোটবেলায় আপনি এত মোবাইল দিতেন না।” আমি বললাম, “তখন তো এত কনটেন্ট ছিল না।” কিন্তু আসল কথা হল, তখন আমিও কম ব্যস্ত ছিলাম।

এখন ভাবি, মোবাইল কি আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ? একদিকে এটা বাচ্চাদের শান্ত রাখে, অন্যদিকে তাদের আসল জগৎ থেকে দূরে নিয়ে যায়।

আমার ছোটবেলায় বিকেলে খেলতে যেতাম। বন্ধুদের সাথে ফুটবল, ক্রিকেট খেলতাম। এখনকার বাচ্চারা বাড়িতে বসে মোবাইলে গেম খেলে।

কিন্তু এটাও তো সত্যি যে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। মোবাইল এখন জীবনের অংশ। বাচ্চারা শিখবে না কেন?

রিফাতকে দেখে মনে হল, হয়তো আমাদের একটা ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে। মোবাইল দেব, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তাদের সাথে সময়ও কাটাতে হবে।

পরের দিন রিফাত আবার এসেছে। এবার আমি মোবাইল না দিয়ে তার সাথে গল্প করার চেষ্টা করেছি। প্রথমে সে অসুবিধা করেছে। কিন্তু পরে আমার সাথে মজা করেছে।

বুঝলাম, বাচ্চাদের আসলে মোবাইল লাগে না। লাগে আমাদের সময়। কিন্তু সেই সময় দেওয়াটাই কঠিন। মোবাইল দেওয়া অনেক সহজ।

হয়তো এটাই আমাদের চ্যালেঞ্জ। সহজ পথ বেছে না নিয়ে বাচ্চাদের জন্য সময় বের করা। তাদের সাথে খেলা, গল্প, হাসি-ঠাট্টা। এগুলোই তো আসল বিনোদন।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *