রাত তিনটা। চোখে ঘুম নেই। পাশে হ্যাপি ঘুমিয়ে। শান্ত নিশ্বাস। আমি ছাদের দিকে তাকিয়ে।
কাল অফিসে শুনেছি গুজব। কোম্পানি ভালো চলছে না। লোকসান হচ্ছে। ছাঁটাই হতে পারে।
ছাঁটাই। এই শব্দটা শুনলে বুকটা কেমন করে ওঠে।
কাকে ছাঁটাই করবে? যারা নতুন, তাদের? নাকি যারা বেশি বেতন পায়, তাদের? নাকি যারা বসের প্রিয় নয়, তাদের?
আমি কোন ক্যাটাগরিতে পড়ি?
নতুন না। দশ বছর আছি। বেশি বেতনও পাই না। তিরিশ হাজার। কিন্তু বসের প্রিয় নই। রাজনীতি জানি না।
পকেট থেকে ফোন বের করলাম। ক্যালকুলেটর খুললাম। হিসাব করতে লাগলাম।
যদি চাকরি চলে যায়, কদিন চলবে? ব্যাংকে জমা পাঁচ হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়া পনেরো হাজার। এক মাসও চলবে না।
নতুন চাকরি খুঁজতে কত সময় লাগবে? তিন মাস? ছয় মাস? এক বছর? এই বয়সে চাকরি পাওয়া সহজ নয়।
হ্যাপি নড়ে উঠল। “ঘুমাচ্ছো না কেন?”
“ঘুম আসছে না।”
“কী ভাবছো?”
বলব কি? বলব যে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছি? বলব যে চাকরি চলে যেতে পারে?
“কিছু না। অফিসের কাজ নিয়ে।”
মিথ্যা কথা।
হ্যাপি আবার ঘুমিয়ে পড়ল। আমি উঠে বসলাম। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
বাইরে নিরব। সবাই ঘুমিয়ে। শুধু আমি জেগে। কেন? কারণ অন্যদের নিরাপত্তা আছে। আমার নেই।
আরাশের কথা ভাবলাম। সে জানে না তার বাবার চাকরি চলে যেতে পারে। জানে না তাকে হয়তো স্কুল ছাড়তে হবে। জানে না পরিবারকে ছোট বাড়িতে যেতে হতে পারে।
সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। এটাই তো ভালো। বাচ্চাদের এইসব জানার দরকার নেই।
কিন্তু আমি কেমন করে ঘুমাব? কেমন করে নিশ্চিন্ত থাকব?
এমন কোনো কাজ নেই যা আমি ছাড়া চলবে না। এমন কোনো দক্ষতা নেই যা অন্যরা পারে না। আমি একজন সাধারণ মানুষ। সাধারণ যোগ্যতা।
যে কোনো সময় বস বলতে পারে, “আপনার আর দরকার নেই।”
কাল যদি এমন হয়? পরশু যদি এমন হয়? আগামী সপ্তাহে? আগামী মাসে?
নিশ্চয়তা কিছু নেই। কোনো গ্যারান্টি নেই।
রাত চারটা। এখনও জেগে। এই অবস্থায় কাল কী করে অফিস যাব? কী করে কাজ করব?
আল্লাহ, এই যে অনিশ্চয়তা, এটা কি আমার ভাগ্যে লেখা? নাকি আমার দোষ?
অন্যরা কেমন করে নিশ্চিন্তে থাকে? তাদের কি ভয় হয় না? নাকি তারা আমার চেয়ে বেশি যোগ্য?
হ্যাপি উঠে বসল। “এখনও জেগে? এই রাতে কী করছো?”
“ঘুম আসছে না।”
“কিছু একটা সমস্যা আছে। বলো না।”
আর লুকাতে পারলাম না। বললাম সব। চাকরির ভয়। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। রাতের এই জাগ্রত থাকা।
হ্যাপি চুপ থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “যা হবার হবে। আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও।”
কিন্তু ছেড়ে দিতে পারছি না। কেমন করে দেব? আমিই তো পরিবারের একমাত্র রোজগার।
রাত পাঁচটা। আর দুই ঘণ্টা পরে উঠতে হবে। অফিস যেতে হবে। হয়তো শেষবারের জন্য।
তবু উঠতে হবে। যেতে হবে। এছাড়া উপায় নেই।
ঘুম আর এলো না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। ভোর পর্যন্ত।
একটু ভাবনা রেখে যান