ব্লগ

জাগ্রত স্বপ্ন

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। হঠাৎ করে নিজেকে প্রশ্ন করলাম—আমি কী করছি? আমি রাস্তায় হাঁটছি। কিন্তু কখন থেকে হাঁটছি? কোথায় যাচ্ছি?

তারপর মনে পড়ল—আমি দোকানে যাচ্ছি। কিন্তু গত দশ মিনিটে কী ভেবেছি, কী দেখেছি, সেসব কিছুই মনে নেই। যেন আমি ঘুমের মধ্যে হেঁটেছি।

এই যে আমি হাঁটছি কিন্তু সচেতন নই—এটা কী? আমি কি আসলেই জেগে আছি? নাকি এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় অবস্থায়?

বাসায় ফিরে হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি কখনো অনুভব করো যে তুমি জেগে আছো কিন্তু সচেতন নও?”

“কেমন?”

“মানে তুমি কাজ করছো, কিন্তু মনে নেই কী করেছো।”

হ্যাপি ভেবে বলল, “হ্যাঁ। রান্না করার সময় মাঝে মাঝে এরকম হয়। হাত নিজেই কাজ করে যায়। মন থাকে অন্য জায়গায়।”

আমি বুঝলাম—আমি একা নই। আমরা সবাই এরকম অবস্থায় থাকি কখনো কখনো।

কিন্তু এটা কতটা? আমাদের জীবনের কতটুকু সময় আমরা এই ‘অটোপাইলট’ মোডে থাকি?

দুপুরে আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি মনে করো তুমি সবসময় জেগে থাকো?”

“জেগে থাকি মানে? আমি তো ঘুমাই না দিনে।”

“না, মানে তুমি কি সবসময় জানো তুমি কী করছো?”

আরাশ একটু ভাবল। “না। মাঝে মাঝে গেম খেলার সময় সময় পার হয়ে যায়। মনে থাকে না।”

আমি অবাক হলাম। এগারো বছরের ছেলেও এই অভিজ্ঞতা পায়।

আমি নিজের দিনটা ভেবে দেখলাম। সকালে ওঠা থেকে রাতে শোয়া পর্যন্ত—কতটুকু সময় আমি সত্যিই ‘উপস্থিত’ ছিলাম?

ব্রাশ করার সময় মন ছিল অন্য জায়গায়। খাওয়ার সময় ভাবছিলাম চাকরির কথা। হাঁটার সময় মন ছিল ভবিষ্যতে।

তাহলে আমি কখন সত্যিকারের ‘জেগে’ ছিলাম?

হয়তো যখন হ্যাপি হেসেছিল। সেই মুহূর্তে আমি পুরোপুরি সেখানে ছিলাম। অথবা যখন আরাশ আমার কোলে এসে বসেছিল। সেই স্পর্শে আমি সম্পূর্ণ সচেতন হয়েছিলাম।

আমি বুঝলাম—আমাদের চেতনার বিভিন্ন স্তর আছে। কখনো আমরা গভীর ঘুমে। কখনো হালকা ঘুমে। কখনো জেগে আছি কিন্তু অনুপস্থিত। আর কখনো পুরোপুরি জাগ্রত।

কিন্তু এই পুরোপুরি জাগ্রত অবস্থা খুবই কম।

রাতে ভাবলাম—কেন আমরা বেশিরভাগ সময় অর্ধচেতন অবস্থায় থাকি? হয়তো কারণ পুরোপুরি সচেতন থাকা কষ্টের। খুব শক্তির প্রয়োজন।

যখন আমি সম্পূর্ণ সচেতন থাকি, তখন প্রতিটি অনুভূতি তীব্র হয়। দুঃখ বেশি দুঃখের। আনন্দ বেশি আনন্দের। সবকিছু প্রখর।

হয়তো আমাদের মন নিজেকে রক্ষা করার জন্য এই অর্ধচেতন অবস্থা তৈরি করে। যাতে আমরা অভিভূত না হয়ে যাই।

কিন্তু এর একটা দাম আছে। আমরা জীবনের অনেক সুন্দর মুহূর্ত মিস করি। কারণ আমরা সেখানে থাকি না।

আমার মনে পড়ল—গত সপ্তাহে যখন বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি জানালায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ সম্পূর্ণ সচেতন হয়ে উঠেছিলাম। বৃষ্টির শব্দ, বাতাসের গন্ধ, ঠাণ্ডার অনুভূতি—সব কিছু এত স্পষ্ট ছিল। সেই মুহূর্তে আমি সত্যিকারের জীবিত ছিলাম।

কিন্তু এরকম মুহূর্ত খুবই কম আসে।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি চেষ্টা করবো বেশি সচেতন থাকার। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় পুরোপুরি ‘উপস্থিত’ থাকার।

পরদিন থেকে একটা এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলাম। দিনে কয়েকবার নিজেকে জিজ্ঞেস করি—”আমি এখন কোথায়? কী করছি? কী অনুভব করছি?”

প্রথমে কঠিন ছিল। বারবার ভুলে যেতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে অভ্যাস হতে লাগল।

একদিন সকালে ব্রাশ করার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিলাম। ব্রাশের অনুভূতি, পেস্টের স্বাদ, পানির শব্দ—সব কিছু অনুভব করলাম। সেই মুহূর্তে আমি পুরোপুরি সেখানে ছিলাম।

আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই সাধারণ কাজটা করতে গিয়ে একটা আনন্দ পেলাম। যেটা আগে কখনো পাইনি।

আমি বুঝলাম—সচেতনতা যেকোনো কাজকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। এমনকি সবচেয়ে সাধারণ কাজকেও।

হ্যাপি একদিন বলল, “তুমি আলাদা লাগছো।”

“কেমন আলাদা?”

“বেশি মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছো। চোখে অন্য ভাব।”

আমি খুশি হলাম। মানে আমার এই চেষ্টা কাজ করছে।

আরাশও একদিন বলল, “বাবা, তুমি আগের চেয়ে বেশি আমার সাথে আছো।”

এই কথাটা শুনে আমার চোখে পানি এসে গেল। আমি বুঝলাম—সচেতনতা শুধু আমার জন্য নয়। এটা আমার পরিবারের জন্যও।

যখন আমি সত্যিকারের ‘উপস্থিত’ থাকি, তখন তারাও সেটা অনুভব করে। আমাদের সম্পর্ক আরো গভীর হয়।

আমার মনে হল—হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সচেতন থাকা। জাগ্রত থাকা। এই মুহূর্তে থাকা।

কারণ জীবন ঘটে এই মুহূর্তেই। অতীত চলে গেছে। ভবিষ্যৎ এখনো আসেনি। আমাদের কাছে আছে শুধু এই মুহূর্ত।

আর এই মুহূর্তে সচেতন না থাকলে আমরা আসলে বেঁচে নেই। আমরা শুধু সময় পার করছি।

এই উপলব্ধিটাই হয়তো সবচেয়ে বড় জাগরণ।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *