ব্লগ

জানালার ওপারে

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে অফিসে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাত থেকেই আকাশ ভেঙে পড়া বৃষ্টি দেখে মনে হলো—আজ আর যাওয়া হবে না। ফোন করে ছুটি নিয়ে নিলাম। হ্যাপি প্রথমে একটু রাগ করলো—”আবার চাকরি চলে যাবে”—কিন্তু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলো। আরাশ স্কুল থেকে ভিজে ফিরে এসে বললো, “আব্বু, আজ বাইরে কেউ নেই।”

আমি জানালার পাশে বসে আছি। এখানে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হলো—আমি কি আসলে ভেতরে, নাকি বাইরে? এই যে কাঁচ, এ কি আমাকে রক্ষা করছে, নাকি বন্দী করে রেখেছে?

বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু ‘পড়া’ শব্দটা ঠিক নয়। বৃষ্টি আসলে উঠছে—মাটি থেকে আকাশে। প্রতিটি ফোঁটা যেন পৃথিবীর একটা করে গোপন কথা নিয়ে উড়ে যাচ্ছে ওপরে। আর আমি এখানে বসে দেখছি এই উল্টো যাত্রা।

রাস্তায় একটা মানুষ দাঁড়িয়ে। ছাতা নেই। কিন্তু সে দৌড়াচ্ছে না। দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টিতে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না এই দূরত্ব থেকে, কিন্তু আমি জানি—সেও আমার মতো কিছু একটা বুঝতে চাইছে। হয়তো সেও প্রশ্ন করছে—এই ভিজে যাওয়াটা কী? এটা কি শাস্তি, নাকি পুরস্কার?

আরাশ এসে আমার পাশে বসলো। “আব্বু, ঐ মানুষটা কেন দাঁড়িয়ে?” আমি বললাম, “হয়তো সে ভাবছে।” “কী ভাবছে?” “হয়তো ভাবছে—পৃথিবীটা আসলে কী?”

আরাশ জানালায় নিঃশ্বাস ফেলে একটা গোল দাগ তৈরি করলো। তারপর আঙুল দিয়ে তার মধ্যে মুখ আঁকলো। হাসি মুখ। “দেখো আব্বু, ও হাসছে।”

আমি দেখলাম। জানালার কাঁচে একটা মুখ হাসছে। কিন্তু এ আরাশের আঁকা, না আমার প্রতিবিম্ব, না বাইরের কোনো অদৃশ্য মুখ? হঠাৎ মনে হলো—সব মুখই হয়তো একই মুখ। আমার, আরাশের, ঐ বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার, এমনকি এই বৃষ্টিরও একটা মুখ আছে।

হ্যাপি চা নিয়ে এলো। “কী ভাবো এত?” তার প্রশ্নে আমি বললাম, “ভাবছি—আমি কে?” সে হেসে বললো, “তুমি হায়দার। আমার স্বামী। আরাশের বাবা।” “কিন্তু এগুলো তো সম্পর্ক। আমি কে?” হ্যাপি থেমে গেলো। তারপর বললো, “তুমি যে আমাকে এই প্রশ্ন করতে পারো, তুমি সেই।”

আমি কাপে চুমুক দিলাম। গরম চা। কিন্তু কেন গরম? কেন ঠাণ্ডা নয়? কে ঠিক করেছে যে গরম মানে আরাম, আর ঠাণ্ডা মানে কষ্ট? এই যে আমি চা খাচ্ছি—এটা কি আমার সিদ্ধান্ত, নাকি লক্ষ কোটি বছরের বিবর্তনের নিয়ন্ত্রণ?

বৃষ্টি আরো জোরে হলো। আমি জানালায় কান পেতে রইলাম। এই শব্দ—এটা কি শুধু পানির ফোঁটা পৃথিবীকে আঘাত করার শব্দ? নাকি এটা পৃথিবীর কান্নার আওয়াজ? নাকি আনন্দের হাসি?

হঠাৎ আমার মনে হলো—আমি যদি এই জানালা না থাকতো? যদি দেয়াল না থাকতো? তাহলে আমি কি এই বৃষ্টিকে আলাদা কিছু মনে করতাম? আমি আর বৃষ্টি তো আসলে একই পদার্থ—পানি। তাহলে আমি কেন ভাবি যে আমি আলাদা?

আরাশ আমার হাত ধরলো। “বাবা, তুমি কাঁদছো?” আমি চোখে হাত দিলাম। ভেজা। কখন কেঁদেছি? কেন কেঁদেছি? “না বাবা, কাঁদছি না। চোখে পানি এসেছে।” “পানি কেন আসে?” “হয়তো ভেতরের বৃষ্টি।”

এই যে ভেতরের বৃষ্টি—এ কোথা থেকে আসে? আমার মা কি কেঁদেছিলেন যখন আমার জন্ম হয়েছিল? আনন্দে, নাকি কষ্টে? আর সেই কান্নার পানি কি আমার মধ্যে রয়ে গেছে? আমার বাবা যখন মারা গেলেন, আমি কেঁদেছিলাম। সেই পানি কি শেষ হয়ে গেছে, নাকি আজও বয়ে চলেছে?

বাইরের মানুষটা চলে গেছে। কিন্তু তার জায়গায় আর একজন এসেছে। এভাবেই চলে। একজন যায়, আর একজন আসে। আমিও একদিন যাবো। আরাশ আসবে আমার জায়গায়। সেও কি এই জানালায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখবে? সেও কি প্রশ্ন করবে—আমি কে?

কিন্তু প্রশ্নটা কি সেই? আমি কে—এর উত্তর খোঁজার চেয়ে বরং প্রশ্নটাই কি মূল কথা? প্রশ্ন করতে পারাটাই কি আসল পরিচয়? আমি প্রশ্ন করি, তাই আমি আছি?

হ্যাপি এসে আমার কাঁধে হাত রাখলো। “কী হয়েছে?” আমি তার দিকে তাকালাম। তিরিশ বছর ধরে এই মুখ দেখছি। কিন্তু আজ মনে হলো—এই মুখ আমি এই প্রথম দেখছি। হ্যাপি কে? সে কি শুধু আমার স্ত্রী? নাকি সে একটা স্বতন্ত্র জগৎ, যার সাথে আমার পরিচয় ঘটনাক্রমে?

“তুমি কে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। হ্যাপি অবাক হয়ে বললো, “মানে?” “তুমি কে? তোমার ভেতরে কী আছে? তুমি কেন আমাকে ভালোবাসো? এই ভালোবাসাটা কোথা থেকে আসে?”

হ্যাপি একটু ভাবলো। তারপর বললো, “আমি জানি না। কিন্তু আমি জানি যে আমি জানি না। এটাই কি যথেষ্ট নয়?”

আমি হেসে ফেললাম। হ্যাপি ঠিক বলেছে। না জানাটা জানা—এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় জ্ঞান। আমি জানি না আমি কে। আমি জানি না কেন এই বৃষ্টি আমাকে আনন্দ দেয়। আমি জানি না কেন আরাশের হাসি আমার বুকে এক ধরনের ব্যথা তৈরি করে—ভালো ব্যথা। আমি জানি না কেন হ্যাপির চোখে আমি নিজেকে খুঁজে পাই।

বৃষ্টি থেমে এলো। সূর্য একটু উঁকি দিলো। আর সাথে সাথে রংধনু দেখা গেলো। আরাশ হাততালি দিয়ে বললো, “বাবা, দেখো! সাত রং!”

আমি দেখলাম। সাত রং। কিন্তু এগুলো কি আসলে আলাদা রং? নাকি একই আলোর ভিন্ন ভিন্ন মুখ? আমরা মানুষেরাও তো এরকম—সাত বিলিয়ন রং, কিন্তু একই আলো।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। জানালা খুলে দিলাম। ভেজা হাওয়া এসে আমার মুখে লাগলো। আমি চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এই যে আমি দাঁড়িয়ে আছি—এটা কি আমার ইচ্ছা? নাকি পৃথিবী আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে?

কিন্তু প্রশ্নগুলো আর কষ্ট দিচ্ছে না। বরং একটা অদ্ভুত শান্তি নেমে এসেছে। যেন বুঝতে পারছি—জানার দরকার নেই। থাকার দরকার আছে। অনুভব করার দরকার আছে। প্রশ্ন করার দরকার আছে। কিন্তু উত্তর পাওয়ার জন্য নয়—প্রশ্ন করতে পারার আনন্দে।

রাস্তায় আবার মানুষজন বেরিয়েছে। জীবন আবার চলতে শুরু করেছে। আমারও কাল অফিসে যেতে হবে। চাকরি খুঁজতে হবে। ভবিষ্যতের চিন্তা করতে হবে। কিন্তু আজকের এই মুহূর্তটা—এই জানালার পাশে দাঁড়ানো, এই বৃষ্টি দেখা, এই প্রশ্ন করা—এটা আমার সাথে থাকবে।

আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম জানালার বাইরে। দু’ফোঁটা বৃষ্টি পড়লো হাতের তালুতে। এই পানি—এটা কি আমার হাতে, নাকি আমি এই পানির হাতে? আমি মুখে নিয়ে খেলাম। মিষ্টি লাগলো। পানির কোনো স্বাদ নেই। তাহলে এই মিষ্টিটা কোথায়? হয়তো জিভে নয়—হয়তো হৃদয়ে।

এই যে আমি এতক্ষণ বসে ছিলাম, চিন্তা করেছিলাম—এটা কি সময় নষ্ট? নাকি এটাই আসল কাজ? হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় কাজ হলো—থেমে দাঁড়ানো। দেখা। অনুভব করা। নিজেকে প্রশ্ন করা।

আরাশ এসে আমার হাত ধরলো। “বাবা, এখন কী করবো?” আমি তার দিকে তাকালাম। আমার ছেলে। আমার ভবিষ্যৎ। আমার অতীত। আমার বর্তমান। “এখন বাঁচবো,” আমি বললাম। “শুধু বাঁচবো।”

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একজন বাবার কষ্টের গল্প যেখানে ফুটে উঠেছে মধ্যবিত্তের হাহাকার। এই ছবিতে দারিদ্র্যের কষাঘাত আর বাবার নীরব ত্যাগ দৃশ্যমান, যা জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে।

জীবন

উপোস

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ · 5 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *