ব্লগ

যে চিঠি কেউ পড়তে পারে না

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গত রাতে চার ঘণ্টা ধরে একটা চিঠি লিখেছিলাম। কলম ধরে রেখেছিলাম এত শক্ত করে যে আঙুলে দাগ পড়ে গেছে। ছয় পাতা ভর্তি করেছি। প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয় থেকে রক্ত ঝরিয়ে লিখেছি।

সকালে উঠে দেখি চিঠিটা আমার সামনে পড়ে আছে। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার – আমি নিজেই আমার লেখা পড়তে পারছি না। হাতের লেখা এত বিকৃত, এত অস্পষ্ট যে মনে হচ্ছে কোনো পাগল মানুষের আঁকিবুকি।

আরাশ এসে দেখে বলল, “বাবা, এগুলো কি ইংরেজি নাকি বাংলা?”

আমি বললাম, “এগুলো… এগুলো আমার ভাষা।”

হ্যাপি চিঠিটা হাতে নিয়ে মাথা নাড়ল। “এটা কি চিঠি নাকি মনের ক্ষোভ?”

কিন্তু তারা জানে না, এই অস্পষ্ট অক্ষরগুলোর পেছনে আমার জীবনের সবচেয়ে স্বচ্ছ সত্যগুলো লুকিয়ে আছে। যে কথাগুলো আমি কোনোদিন কাউকে বলতে পারিনি, সেগুলো রাতের আঁধারে কাগজে ঢেলে দিয়েছি।

ছোটবেলায় একবার মায়ের কাছে একটা চিঠি লিখেছিলাম। স্কুলে মার খেয়েছি, কান্নাকাটি করে বাড়ি এসেছি। মায়ের কাছে সরাসরি বলতে পারিনি। তাই লিখেছিলাম, “মা, আমি কষ্ট পেয়েছি।”

মা চিঠিটা পড়ে হেসেছিলেন। “তোর হাতের লেখা দেখে মনে হয় তুই সত্যিই কষ্ট পেয়েছিস।”

কিন্তু সেদিন বুঝিনি, হাতের লেখা খারাপ হওয়া মানে শুধু অদক্ষতা নয়। এটা মনের একটা রোগ। যখন ভেতরে অশান্তি থাকে, হাতও কাঁপে।

আজ ঊনচল্লিশ বছর বয়সে এসে বুঝি, আমার সারাজীবন একটাই সমস্যা – যা বলতে চাই তা পৌঁছায় না, যা লিখতে চাই তা পড়া যায় না।

অফিসে যখন সাহেবের কাছে আবেদন লিখে দিই, তিনি চোখ কুঁচকে বলেন, “হায়দার, তুমি কি চাও সেটাই বুঝতে পারছি না।” বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে যখন দিনের কষ্টের কথা বলি, সে বলে, “তুমি এত জটিল করে কেন বল?” আরাশের সাথে যখন গভীর কোনো কথা বলার চেষ্টা করি, সে বিরক্ত হয়ে চলে যায়।

আমার ভেতরের মানুষটা যেন এক অজানা ভাষায় কথা বলে, যার অনুবাদ কেউ জানে না।

গত রাতে যে চিঠিটা লিখেছি, সেখানে আমার সব গোপন কথা ছিল। চাকরি না থাকার গভীর অপমান, আরাশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিরাতের দুঃস্বপ্ন, হ্যাপির নীরব ত্যাগের বেদনা। আরো ছিল আল্লাহর কাছে আমার নালিশ – কেন আমাকে এমন বানিয়েছেন যে কিছুই ঠিকমতো বলতে পারি না?

কিন্তু সব কিছু লিখে ফেলার পর দেখি, আমার নিজের চিঠিই আমার কাছে দুর্বোধ্য লাগছে। যেন কোনো পাগল মানুষ তার যন্ত্রণা দেয়ালে আঁচড় দিয়ে লিখে রেখেছে।

হয়তো এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আমার ভেতরে অসংখ্য চিঠি জমে আছে, কিন্তু সবগুলোই অপাঠ্য।

রাতে শুয়ে ভাবি, যদি কোনোদিন এমন একজনের দেখা পাই যে আমার অস্পষ্ট লেখা পড়তে পারে? যে আমার কাঁপা হাতের আঁকিবুকি থেকেও বুঝতে পারে আমি আসলে কী বলতে চেয়েছি?

কিন্তু সে কি আদৌ আছে? নাকি আমার মতো সবাই নিজের নিজের অপাঠ্য চিঠি নিয়ে একা একা বসে আছি?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *