ব্লগ

যে জীবন যাপন করি সেটা কি অন্য কারও?

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া
শেয়ার

কার জীবন বাঁচি আমি?

সকালের চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমি তাকিয়ে আছি কাপের ভেতরে। যেন ওই বাদামি তরলে লুকিয়ে আছে আমার অস্তিত্বের উত্তর। প্রশ্নটা মাথায় এলো হঠাৎই—এই জীবনটা কি আসলেই আমার?

হায়দার। এই নামটা আমার। কিন্তু কবে থেকে আমি হায়দার? মনে করার চেষ্টা করি, খুঁজে পাই না সেই মুহূর্ত যখন আমি সচেতনভাবে হায়দার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমার একটা পরিচয় আছে, একটা সংসার আছে, একটা রুটিন আছে। আমি শুধু সেই জায়গায় বসে গেছি যেটা আমার জন্য খালি রাখা ছিল।

পাশের ঘরে হ্যাপি সকালের নাশতা তৈরি করছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে পরোটা ভাজার শব্দ। আমার স্ত্রী। কিন্তু আমরা কীভাবে একসাথে হয়েছিলাম? চেষ্টা করি মনে করতে—সেই প্রথম দেখার মুহূর্ত, প্রথম কথা, প্রথম অনুভূতি। কিছুই স্পষ্ট নয়। শুধু একটা ঝাপসা ছবি—বিয়ের আসরে আমরা দুজন পাশাপাশি বসে আছি, চারপাশে মানুষ, আমরা চুপচাপ। যেন দুটো অচেনা মানুষ একটা চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে।

হ্যাপির প্রতি আমার কি ভালোবাসা আছে? নাকি এটা শুধু অভ্যাস? দশ বছর একসাথে থাকলে হয়তো ভালোবাসা আর অভ্যাসের মধ্যে পার্থক্য মুছে যায়। সকালে তার জন্য চা বানাই, রাতে তার পাশে শুয়ে থাকি—কিন্তু এই কাজগুলো কি আমার ইচ্ছা থেকে আসে নাকি শুধু করতে হয় বলে করি?

আরাশ এসে আমার কাঁধে হাত রাখে। “আব্বু, অফিসে যাবেন না?” সাত বছরের ছেলে। আমার ছেলে। জিনগতভাবে, জৈবিকভাবে সে আমার। কিন্তু মানসিকভাবে? আমি কি সত্যিই তার বাবা নাকি শুধু একজন পুরুষ যে বাবার ভূমিকা পালন করছে? তাকে ভালোবাসি, এটা জানি। কিন্তু এই ভালোবাসা কি আমার ভেতর থেকে উঠে আসা নাকি সমাজ আমাকে শিখিয়েছে বাবা হলে সন্তানকে ভালোবাসতে হয়?

প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটায় অফিসের জন্য বের হই। গুলশানের একটা কর্পোরেট অফিসে মার্কেটিং ম্যানেজার। ভালো বেতন, নামকরা কোম্পানি। সবাই বলে ভালো চাকরি। কিন্তু আমি কি এই চাকরি চেয়েছিলাম? আমার কি স্বপ্ন ছিল মার্কেটিং ম্যানেজার হওয়ার? মনে নেই। শুধু মনে আছে একদিন ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম, পরে ফোন এসেছিল যে আমি সিলেক্টেড। আমি জয়েন করেছিলাম। ব্যস।

অফিসে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকি। এক্সেল শিট, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন, ইমেইলের পর ইমেইল। এই কাজগুলো কি আমার? নাকি আমি একটা যন্ত্রের মতো চলছি যেটা এই কাজের জন্য প্রোগ্রাম করা হয়েছে?

সহকর্মী রিফাত জিজ্ঞেস করে, “ভাই, আজকে মিটিংয়ে প্রেজেন্টেশন তো আপনার?” আমি মাথা নাড়ি। প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছি, রিহার্সালও দিয়েছি। কিন্তু এই প্রেজেন্টেশনের বিষয়বস্তু নিয়ে আমার কি কোনো মতামত আছে? আমি কি বিশ্বাস করি যেটা বলছি? নাকি শুধু বলছি কারণ বলতে হবে?

দুপুরে খাবার সময় চিন্তা করি আমার পছন্দ-অপছন্দের কথা। আমি ভাত খাই, মাছ পছন্দ করি, চা ছাড়া দিন শুরু হয় না। কিন্তু এগুলো কি আমার পছন্দ? নাকি বাঙালি বলে আমাকে ভাত-মাছ পছন্দ করতে হয়? আমার মা রান্না করতেন এভাবে, আমি খেয়েছি, এখন পছন্দ করি। কিন্তু এই পছন্দ কি আসলে আমার নাকি আমার পরিবেশ আমাকে এভাবে তৈরি করেছে?

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে হ্যাপি বলে, “আজকে খুব চুপচাপ আছেন কেন?” আমি হাসি। বলি, “কিছু না, একটু ক্লান্ত।” কিন্তু আসলে আমি ক্লান্ত নই। আমি হারিয়ে গেছি। হারিয়ে গেছি আমার নিজের কাছে।

রাতে আরাশকে ঘুম পাড়াই। গল্প বলি। সে জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, আপনি বড় হয়ে কী হতে চেয়েছিলেন?” প্রশ্নটা আমাকে থমকে দেয়। আমি কী হতে চেয়েছিলাম? কোনো স্বপ্ন ছিল? লেখক? শিল্পী? ভ্রমণকারী? কিছু মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে সবাই বলত ভালো চাকরি করতে হবে, সংসার সামলাতে হবে। আর আমি সেটাই করছি।

বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। পাশে হ্যাপি ঘুমিয়ে পড়েছে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনি। নিয়মিত, শান্ত। এই মুহূর্তটা আমার জীবনের প্রতিটা রাতের মতো। কিন্তু হঠাৎ মনে হয় এই জীবনটা আমার জন্য নয়।

কোথাও আরেকটা জীবন আছে। সেখানে আমি অন্য কেউ। হয়তো একজন লেখক যে সকালবেলা কফি নিয়ে সমুদ্রের ধারে বসে লেখে। হয়তো একজন শিক্ষক যে ছোট একটা গ্রামে বাচ্চাদের পড়ায়। হয়তো একজন সাধারণ মানুষ যার স্ত্রী অন্য কেউ, সন্তান অন্য কেউ, চাকরি অন্য কিছু।

কিন্তু সেই জীবনটা কোথায়? আমি কি ভুল পথে এসে পড়েছি? কোথাও কি একটা মোড় ছিল যেখানে আমার যেতে হতো ডানদিকে কিন্তু আমি গিয়েছি বামদিকে?

আমি কি আমার জীবন বেছে নিয়েছি নাকি জীবন আমাকে বেছে নিয়েছে?

মাঝরাতে নামাজ পড়ি। সিজদায় মাথা রেখে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “ইয়া আল্লাহ, আমি কে? আমার জীবন কী? আমি কি ঠিক পথে আছি?” কিন্তু উত্তর আসে না। হয়তো উত্তর নেই। হয়তো এই প্রশ্নগুলোই আমার নিয়তি।

পরের দিন সকালে আবার একই রুটিন। চা, নাশতা, অফিস। হ্যাপি জিজ্ঞেস করে, “আজকে সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি আসবেন? আরাশের স্কুলের অনুষ্ঠান আছে।” আমি বলি, “হ্যাঁ, আসব।” আর ভেতরে ভেতরে ভাবি, আমি কি আসলেই আসতে চাই? নাকি আসা উচিত বলে আসব?

অফিসে বসে মিটিং করি, ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলি, রিপোর্ট লিখি। সব যান্ত্রিকভাবে। কোনো আবেগ নেই, কোনো উত্তেজনা নেই। শুধু একটা দায়িত্ব পালন।

বিকেলে চা খেতে খেতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। রাস্তায় মানুষ হাঁটছে। প্রত্যেকেই নিজের গন্তব্যে যাচ্ছে। তারাও কি জানে তারা কোথায় যাচ্ছে? নাকি তারাও শুধু হাঁটছে কারণ হাঁটতে হয়?

সন্ধ্যায় আরাশের স্কুলে যাই। সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে কবিতা আবৃত্তি করছে। আমি তালি দিই, হাসি, গর্বিত বাবার মতো আচরণ করি। কিন্তু ভেতরে অনুভব করি একটা শূন্যতা। যেন আমি একজন দর্শক যে একটা নাটক দেখছে যেখানে আমার চরিত্র আছে কিন্তু আমি নেই।

রাতে আবার সেই সিলিং, সেই অন্ধকার, সেই প্রশ্ন। এই জীবনটা কার?

হয়তো সত্যি হলো আমাদের কারোরই জীবন আমাদের নিজেদের নয়। আমরা সবাই শুধু অভিনয় করছি। আমাদের জন্য লেখা স্ক্রিপ্ট পড়ছি। কিন্তু লেখক কে? পরিচালক কে?

আমি জানি না উত্তর। হয়তো কখনো জানব না। হয়তো এই না-জানাটাই আমার নিয়তি। হয়তো এই প্রশ্ন করাটাই আমার একমাত্র স্বাধীনতা।

তাই প্রতিদিন সকালে উঠি, চা খাই, অফিসে যাই, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরি, রাতে ঘুমাই। আর সাথে নিয়ে চলি এই সন্দেহ—এই জীবনটা কি সত্যিই আমার?

এই প্রশ্ন আমাকে ভাঙে না, আমাকে থামায় না। শুধু আমার সাথে থাকে। একটা ছায়ার মতো। একটা ফিসফিসানির মতো। একটা অস্পষ্ট অস্বস্তির মতো।

আর হয়তো এই অস্বস্তিটাই আসল। হয়তো এই প্রশ্নটাই প্রমাণ যে আমি জীবিত। কারণ মৃত মানুষ প্রশ্ন করে না।

তাই আমি বাঁচি। অনিশ্চিত, সন্দিগ্ধ, প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু বাঁচি। হয়তো এটাই যথেষ্ট।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *