ব্লগ

জেগে থাকা ওষুধ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রাত ১২টায় একটা ট্যাবলেট খেলাম। ডাক্তার বলেছিল – “খেলেই ঘুম আসবে।”

রাত ১টা। এখনো জেগে আছি। ট্যাবলেটটা কাজ করছে না মনে হয়।

রাত ২টা। চোখ ভারী লাগছে, কিন্তু মন জেগে আছে। অদ্ভুত একটা অবস্থা। শরীর ঘুমাতে চায়, কিন্তু মাথা চলছে।

যেন দুটো আলাদা জিনিস। শরীর আর মন।

ট্যাবলেট শরীরে কাজ করছে। পেশী শিথিল হয়ে যাচ্ছে। চোখের পাতা ভারী। কিন্তু ব্রেইনের ভেতর চলছে পার্টি।

মনে হচ্ছে আমার মাথায় একটা টিভি আছে। সেই টিভিতে চলছে আজকের সব ঘটনা। রিওয়াইন্ড হয়ে আবার চলছে।

অফিসে বসের সাথে কথা হয়েছিল। কী বলেছিলাম? কী বলা উচিত ছিল? আবার শুরু হয় সেই কথোপকথন। মাথার ভেতর।

এবার অন্যভাবে বলি। বসকে ঠিক মতো জবাব দেই। কিন্তু সেটা তো এখন হতে পারে না। ইতিমধ্যে সেই মুহূর্ত চলে গেছে।

কিন্তু ব্রেইন মানছে না। সে বারবার সেই scene replay করছে।

রাত ৩টা। আরেকটা ট্যাবলেট খাব কি না ভাবছি। ডাক্তার বলেছিল – “একটার বেশি খাবেন না।”

কিন্তু একটায় কাজ হচ্ছে না।

হয়তো আমার মন বেশি শক্তিশালী। হয়তো ওষুধ আমার চিন্তার চেয়ে দুর্বল।

এই কথা ভেবে একটা গর্ব হয়। আমার মন এত strong যে ওষুধও তাকে দমাতে পারে না।

কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় – এটা গর্বের ব্যাপার নাকি সমস্যার?

যদি আমার মন এত hyperactive যে ওষুধেও শান্ত হয় না, তাহলে আমি কীভাবে ঘুমাব?

রাত ৪টা। এখনো জেগে আছি। কিন্তু অদ্ভুত একটা অনুভূতি। আমি জেগে আছি, কিন্তু জেগে নেই।

যেন আমি দুই জগতের মধ্যে আটকে গেছি। ঘুমের জগত আর জাগার জগত।

স্বপ্নের মতো কিছু দেখছি, কিন্তু জানি যে আমি জেগে আছি। জাগার মতো কিছু ভাবছি, কিন্তু সেগুলো অবাস্তব।

ট্যাবলেট আমাকে একটা weird zone-এ নিয়ে গেছে।

মনে হচ্ছে আমি একটা zombie। অর্ধেক মৃত, অর্ধেক জীবিত। চলছি, কিন্তু অচেতনভাবে।

এই অবস্থায় আমি কে? আমি কি সেই ব্যক্তি যে ট্যাবলেট খাওয়ার আগে ছিল? নাকি আমি হয়ে গেছি ওষুধের একটা side effect?

মাঝে মাঝে মনে হয় – আমি হয়তো আসলেই ঘুমিয়ে আছি। আর এই যে মনে হচ্ছে জেগে আছি, সেটা একটা স্বপ্ন।

কিন্তু স্বপ্নে ঘুমের ওষুধ খাওয়ার কথা মনে থাকে না। আর আমার মনে আছে।

রাত ৫টা। ভোর হতে শুরু করেছে। পাখি ডাকছে। পৃথিবী জেগে উঠছে।

আর আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি।

এটা একটা উল্টো পৃথিবী। আমি রাতে জাগি, দিনে ঘুমাতে চাই।

কিন্তু দিনে ঘুমাতে দেবে কে? অফিস যেতে হবে। কাজ করতে হবে।

ট্যাবলেট খেয়ে আমি আরো বিপদে পড়েছি।

রাত ৬টা। হাল ছেড়ে দিলাম। উঠে পড়লাম। চা বানালাম।

কাপে চুমুক দিয়ে ভাবছি – এই ট্যাবলেট কার জন্য কাজ করে? যাদের মন এত active নয়? যারা সহজেই surrender করতে পারে?

নাকি আমার মনের গভীরে এমন কিছু আছে যেটা ঘুমাতে চায় না? যেটা জেগে থাকতে চায়?

হয়তো ঘুম মানে surrendering। আর আমি surrender করতে পারি না।

হয়তো আমি কন্ট্রোল ছাড়তে ভয় পাই। ভয় পাই যে ঘুমের মধ্যে কী হবে। স্বপ্নে কী দেখব।

ট্যাবলেট আমার শরীরকে ঘুম পাড়াতে পেরেছে। কিন্তু আমার ভয়কে ঘুম পাড়াতে পারেনি।

সকালে অফিস যাব। সবাই জিজ্ঞেস করবে – “রাতে ভালো ঘুম হয়েছে?”

আমি বলব – “হ্যাঁ।”

কিন্তু কথাটা হবে মিথ্যা। রাতে ঘুম হয়নি। রাতে হয়েছে একটা experiment। আমার মন আর ওষুধের মধ্যে একটা লড়াই।

আর সেই লড়াইয়ে মন জিতেছে।

এটা ভালো খবর নাকি খারাপ খবর, জানি না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *