রাত দুইটা। আরাশ আর হ্যাপি ঘুমিয়ে। আমি জেগে আছি। বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে।
আমার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে: আরাশের ভবিষ্যৎ।
দিনের বেলা এই চিন্তা থাকে না। দিনের বেলা আমি ব্যস্ত থাকি কাজে। কিন্তু রাতে, এই নিস্তব্ধতায়, সব ভয় জেগে ওঠে।
আরাশ এখন এগারো বছর। আর মাত্র সাত বছর পর ওর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়।
আমি হিসাব করি। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে কত টাকা লাগবে? আমার কাছে সেই টাকা আছে কি?
নেই।
আমার বর্তমান আয়ে আরাশকে ভালো উচ্চশিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।
আমি ভাবি, আমি কি আরাশের স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াব? আমার আর্থিক অক্ষমতার জন্য কি আরাশের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে?
আরাশ ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু মেডিকেল পড়তে লাখ লাখ টাকা লাগে। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে তো কোটি টাকা।
আমার কাছে সেই টাকা নেই। কোথায় পাব?
আমি ভাবি, আরাশের মেধা আছে। কিন্তু মেধা দিয়ে কি সবকিছু হয়? টাকা ছাড়া কি মেধার মূল্য আছে?
আমি অন্য বাবাদের দেখি। যারা তাদের সন্তানদের ভালো স্কুল, ভালো কোচিং, ভালো বিশ্ববিদ্যালয় দিতে পারে।
আমি কি আরাশকে সেসব দিতে পারব?
আমি ভাবি, আমার সন্তানের জন্য আমি কী করতে পারি? আমি কি যথেষ্ট চেষ্টা করছি?
আমি রাতে বেশি কাজ করি। অতিরিক্ত আয়ের চেষ্টা করি। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়।
আমি ভাবি, আমি কি একটা লোন নেব? কিন্তু লোন শোধ করব কীভাবে?
আমি ভাবি, আমি কি আরাশকে বলব যে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে দিতে? কিন্তু একটা বাবা কীভাবে তার সন্তানের স্বপ্ন ভাঙে?
আমার মনে হয়, আমি একটা দুষ্টচক্রে পড়ে গেছি। আমি গরিব, তাই আমার সন্তানও গরিব থাকবে। কারণ আমি তাকে সেই সুযোগ দিতে পারব না যা দিয়ে সে গরিবত্ব থেকে বের হতে পারে।
এই চিন্তা আমাকে পাগল করে তোলে।
আমি ভাবি, আমি কি একজন ব্যর্থ বাবা? আমি কি আমার সন্তানের জন্য যথেষ্ট করতে পারছি না?
আমি আরাশের মুখের দিকে তাকাই। ও নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ওর মনে কোনো চিন্তা নেই।
কিন্তু আমার মনে শুধু চিন্তা।
আমি ভাবি, আরাশ যখন বুঝবে যে তার বাবা তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারছে না, তখন ও কী ভাববে?
আমি ভাবি, আমার বাবাও কি এমনি ভাবতেন? উনিও কি রাতে জেগে থেকে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতেন?
আমি কখনো জানতে পারিনি। কারণ উনি কখনো তার চিন্তা প্রকাশ করেননি।
আমিও আমার চিন্তা আরাশকে বলি না। কিন্তু এই চিন্তা আমাকে খুবলে খাচ্ছে।
আমি ভাবি, আমি কি হ্যাপিকে বলব? কিন্তু ও ইতিমধ্যে অনেক চাপে আছে।
আমি ভাবি, আমি কি কারো সাহায্য চাইব? কিন্তু আমার গর্বে বাধে।
আমি ভাবি, আমি কি আল্লাহর কাছে দোয়া করব? কিন্তু দোয়া কি যথেষ্ট? নাকি কাজও করতে হবে?
আমি ভাবি, আগামী বছর থেকে আমি আরো বেশি কাজ করব। আরো সঞ্চয় করব। হয়তো আরাশের জন্য একটা শিক্ষা বীমা কিনব।
কিন্তু এসব যথেষ্ট হবে কি?
আমি জানি না।
আমি ভাবি, অন্য বাবারাও কি এমনি রাতে জেগে থেকে চিন্তা করে? নাকি শুধু আমিই এত দুর্বল?
আমি ভাবি, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা কি বাবার দায়িত্ব, নাকি এটা একটা রোগ?
আমি জানি না।
আমি শুধু জানি, আমি আরাশকে ভালোবাসি। আর সেই ভালোবাসার কারণেই আমি চিন্তিত।
আমি চাই আরাশ সুখী হোক। সফল হোক। তার স্বপ্ন পূরণ হোক।
কিন্তু আমি জানি না, আমি সেটা নিশ্চিত করতে পারব কিনা।
এই না-জানা আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না।
আমি আবার ছাদের দিকে তাকাই। আর ভাবি, আগামীকাল আমি কী করব আরাশের ভবিষ্যতের জন্য?
সকাল হলে আমি একটা উত্তর খুঁজে নেব। কিন্তু এই রাতে, এই অন্ধকারে, আমি শুধু ভয়ে ভুগি।
আরাশের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভয়ে।
একটু ভাবনা রেখে যান