ব্লগ

ঝুলে থাকা দিন

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

কম্পিউটার অন করে দেখি—আজ কোনো মেসেজ নেই। কোনো প্রোজেক্ট নেই। কোনো ক্লায়েন্ট নেই। শূন্য ইনবক্স। শূন্য ইনকাম।

তিন মাস হলো চাকরি ছেড়েছি। ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছি। “স্বাধীনতা” নামের এক অজানা জগতে পা রেখেছি।

প্রথম মাসে ভেবেছিলাম—এতদিন কেন চাকরি করলাম? নিজের সময়, নিজের ইচ্ছে। কোনো বসের চাপ নেই। কিন্তু দ্বিতীয় মাস থেকে বুঝতে পারলাম—স্বাধীনতার দাম অনিশ্চয়তা।

আজ দুপুর হয়ে গেল। এখনো কাজ পাইনি। আজকে কি খাবো? এই মাসের বাড়ি ভাড়া দেব কীভাবে? এই প্রশ্নগুলো প্রতিদিন করতে হয়। চাকরি থাকলে এই প্রশ্ন আসত না।

অপেক্ষা। ফ্রিল্যান্সিং এর সবচেয়ে বড় অংশ অপেক্ষা। ক্লায়েন্টের রিপ্লাইয়ের অপেক্ষা। পেমেন্টের অপেক্ষা। নতুন প্রোজেক্টের অপেক্ষা।

মাঝে মাঝে ভাবি—চাকরি ভালো ছিল। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট টাকা। নিশ্চিত আয়। এখন? আজ দশ হাজার, কাল শূন্য। পরশু পাঁচ হাজার। অঙ্ক মেলানো কঠিন।

চাকরিতে থাকলে বলতাম—”আজ শুক্রবার, বিশ্রাম।” এখন শুক্রবারও কাজ খুঁজি। সাপ্তাহিক ছুটি বলে কিছু নেই। প্রতিদিন কাজের দিন, প্রতিদিন অনিশ্চয়তার দিন।

কিন্তু যখন প্রোজেক্ট পাই, অন্য সুখ। নিজের পছন্দের কাজ। নিজের শর্তে। কেউ বলে না কখন উঠব, কখন বসব। সকাল দশটায় কাজ শুরু করব না সন্ধ্যা ছয়টায়, সেটা আমার ইচ্ছা।

ক্লায়েন্ট রিভিউ দিয়েছে—”Excellent work!” মনে হলো পাহাড় জিতেছি। কিন্তু পরের দিন নতুন অনিশ্চয়তা। আবার কাজ খোঁজা।

সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার—সামাজিক চাপ। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে, “কোথায় চাকরি?” বলি, “ফ্রিল্যান্সিং করি।” তাদের মুখের ভাব দেখে বোঝা যায়—”ওহ, বেকার।”

পরিবার আরো চিন্তিত। “চাকরি খোঁজ,” “নিরাপত্তা দরকার,” “ফ্রিল্যান্সিং কতদিন চলবে?” এই প্রশ্নগুলো আমার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে।

কিন্তু মাঝে মাঝে রাতে কাজ করতে করতে ভাবি—আমি কি খুশি? উত্তর জটিল। অর্থনৈতিক স্ট্রেস আছে। কিন্তু মানসিক শান্তি আছে।

চাকরিতে প্রতিদিন অ্যালার্মের শব্দে উঠতাম। এখন নিজের ইচ্ছায় উঠি। চাকরিতে বোর হতাম। এখন প্রতিদিন নতুন চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে বড় পার্থক্য—আমি এখন নিজের বস। নিজেকে ম্যানেজ করি। নিজের সাথে মিটিং করি। নিজের কাছে রিপোর্ট করি।

কিন্তু এই স্বাধীনতার পেছনে একটা ভয় লুকিয়ে আছে। “যদি কাজ না পাই? যদি ব্যর্থ হই? যদি চাকরিতে ফিরে যেতে হয়?”

ফ্রিল্যান্সিং একটা দোলনার মতো। কখনো উপরে—অনেক কাজ, অনেক টাকা। কখনো নিচে—কোনো কাজ নেই, কোনো টাকা নেই।

হয়তো এটাই জীবন। স্থিতিশীলতা নাকি স্বাধীনতা—দুটোর একসাথে পাওয়া কঠিন।

কিন্তু যে কদিন ভালো প্রোজেক্ট পাই, সেই কদিন মনে হয়—স্বাধীনতার জন্য অনিশ্চয়তা সহ্য করা যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে—কতদিন সহ্য করতে পারব?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *