আমার হৃদস্পন্দন গুনি। একশো আটান্ন বার। প্রতিটি স্পন্দনই একটি প্রতিবাদ – মৃত্যুর বিরুদ্ধে। কিন্তু কোন মৃত্যুর বিরুদ্ধে? দেহের নাকি আত্মার? জন্মের প্রথম দিন থেকেই আমরা মরতে শুরু করি। তাহলে বাঁচাটা আসলে মরাকে প্রতিবাদ করা?
সকালে ঘুম ভেঙে প্রথম যে কাজটি করি – চোখ খুলি। এই চোখ খোলাটাও কি একধরনের প্রতিবাদ নয়? ঘুমের বিরুদ্ধে, অচেতনতার বিরুদ্ধে। প্রতিদিন জন্ম নেওয়া। প্রতিদিন নিজেকে আবিষ্কার করা।
আমার সন্তান ঘুমিয়ে আছে। তার মুখে একটা শান্তি। সে জানে না যে বেঁচে থাকাটাই একটা কাজ। একটা ক্রমাগত প্রতিবাদ। আমি তার দিকে তাকিয়ে মনে করি আমার প্রথম কান্নার কথা। সেই কান্নায় কী ছিল? ভয়? রাগ? নাকি আনন্দ?
হয়তো কান্নাটা ছিল জানান দেওয়া। বলা যে আমি এসেছি। আমি আছি। তাহলে প্রতিটি শিশুর প্রথম কান্না আসলে পৃথিবীর সামনে তার জীবনের প্রথম বিবৃতি। একটা স্বতন্ত্র অস্তিত্বের ঘোষণা।
স্ত্রী এখনো ঘুমিয়ে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনি। তার ঘুমেও একটা প্রতিবাদ আছে। দিনের ক্লান্তির বিরুদ্ধে, চাপের বিরুদ্ধে। ঘুম হয়তো আত্মরক্ষার একটা পদ্ধতি।
অফিসে যাওয়ার সময় দেখি মানুষজন হাঁটছে। সবার হাঁটায় একটা তাড়া। একটা উদ্দেশ্য। এই হাঁটাটাও কি প্রতিবাদ? স্থির থাকার বিরুদ্ধে? নাকি কোথাও পৌঁছানোর প্রয়োজনেই আমরা হাঁটি?
বাবার কথা মনে পড়ে। তিনি চলে গেছেন। কিন্তু তার চলে যাওয়াটাও কি একরকম প্রতিবাদ ছিল? জীবনের কষ্টের বিরুদ্ধে? নাকি মৃত্যু আসলে জীবনের শেষ প্রতিবাদ?
আমি প্রার্থনা করি। মাথা নত করি। কিন্তু এই নত করাও কি আত্মসমর্পণ নাকি প্রতিবাদ? আমি বলি আমি অসহায়। কিন্তু এই স্বীকারোক্তির মধ্যে কি লুকিয়ে নেই একটা শক্তি? যে জানে সে জানে না, সে কি সবচেয়ে জ্ঞানী?
রাতে খাবার খাই। প্রতিটি গ্রাসই বলে আমি বাঁচতে চাই। ক্ষুধাও তাহলে একটা প্রতিবাদ। মৃত্যুর বিরুদ্ধে। আর খাওয়া হলো সেই প্রতিবাদের উত্তর।
বন্ধুদের সাথে কথা বলি। হাসি। কান্নাও করি। এই সব আবেগ কি প্রতিবাদের ভিন্ন রূপ? হাসি হয়তো দুঃখের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আর কান্না হয়তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই একটা প্রতিবাদ চলছে। নিঃশ্বাস নেওয়া থেকে শুরু করে স্বপ্ন দেখা পর্যন্ত। আমি প্রতিবাদ করছি শূন্যতার বিরুদ্ধে। অর্থহীনতার বিরুদ্ধে।
তাহলে বেঁচে থাকাটাই কি সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ? আর প্রতিটি মানুষের জন্মের প্রথম কান্নাই কি সেই প্রতিবাদের শুরু?
হয়তো আমার প্রথম কান্নায়ই তৈরি হয়েছিল আমার জগত। একটা জগত যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত একটা যুদ্ধ। বাঁচার যুদ্ধ। থাকার যুদ্ধ। হয়ে ওঠার যুদ্ধ।
আর এই যুদ্ধটাই হয়তো জীবনের আসল মানে।
একটু ভাবনা রেখে যান