গতকাল বাসে উঠে দেখি একজন ব্যবসায়ী ফোনে বলছেন, “এখন আমার জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে। বড় বাড়ি, গাড়ি, সব আছে।” কিন্তু তার মুখে ক্লান্তি, চোখে উদ্বেগ। আমি ভাবলাম – উন্নত জীবনযাত্রার মান কি উন্নত জীবন নিশ্চিত করে?
রিকশায় চড়ে দেখি রিকশাওয়ালা গুনগুন করে গান গাইছেন। তার জীবনযাত্রার মান নিম্নমানের – ছোট ঘর, সামান্য উপার্জন। কিন্তু তার মুখে শান্তি, গলায় সুর। তার জীবনের মান কি ওই ব্যবসায়ীর চেয়ে কম?
চায়ের দোকানে বসে দেখি একজন অফিস কর্মচারী অভিযোগ করছেন, “বেতন কম, খরচ বেশি। ভালো খেতে পারি না, ভালো পোশাক কিনতে পারি না।” কিন্তু পাশেই বসে একজন মুটে মজার গল্প বলে সবাইকে হাসাচ্ছেন। কার জীবন বেশি সমৃদ্ধ?
হাসপাতালে দেখি দুজন রোগী। একজন প্রাইভেট রুমে, এসি, টিভি, সব সুবিধা। অন্যজন সাধারণ ওয়ার্ডে। কিন্তু প্রাইভেট রুমের রোগী একা, বিষণ্ণ। সাধারণ ওয়ার্ডের রোগী পরিবার-পরিজন নিয়ে হাসিখুশি। কোনটা ভালো চিকিৎসা?
বাজারে দেখি এক ভদ্রমহিলা দামী কাপড় কিনছেন। তার পার্স ভর্তি টাকা, হাতে স্মার্টফোন। কিন্তু দোকানদারের সাথে রুক্ষ ব্যবহার করছেন। পাশে একজন সাধারণ গৃহিণী কম দামি শাড়ি কিনছেন, কিন্তু সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন। কার জীবন বেশি সুন্দর?
আমার মনে হয়, আমরা জীবনযাত্রার মান আর জীবনের মান গুলিয়ে ফেলি। জীবনযাত্রার মান মাপা যায় টাকায়, জিনিসপত্রে। কিন্তু জীবনের মান মাপা যায় শান্তিতে, সম্পর্কে, তৃপ্তিতে।
পার্কে দেখি একজন ধনী ব্যক্তি তার ছেলেকে দামী খেলনা দিয়েছেন। কিন্তু ছেলে খেলছে একা। পাশে একটা গরিব পরিবারের সন্তানরা একটা ফুটবল নিয়ে সবাই মিলে খেলছে। কোন শৈশব বেশি সমৃদ্ধ?
ট্রেনে দেখি একজন উচ্চবিত্ত মানুষ এসি কামরায় বসে আছেন। সব সুবিধা, কিন্তু কারো সাথে কথা বলছেন না। সাধারণ কামরায় মানুষ গল্প করছে, হাসছে, খাবার ভাগাভাগি করছে। কোথানে যাত্রা বেশি আনন্দদায়ক?
রেস্তোরাঁয় দেখি একটা পরিবার দামী খাবার অর্ডার করেছে। কিন্তু সবাই নিজ নিজ ফোনে ব্যস্ত। কথা বলছে না। পাশের টেবিলে আরেকটা পরিবার সাধারণ খাবার খাচ্ছে, কিন্তু একসাথে গল্প করছে, হাসছে। কোন খাওয়া বেশি পুষ্টিকর?
আমার মনে হয়, জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর ধান্দায় আমরা জীবনের মান হারিয়ে ফেলি। আমরা বেশি কিনতে পারি, কিন্তু কম উপভোগ করি। আমাদের বাড়ি বড় হয়, কিন্তু সম্পর্ক ছোট হয়। আমাদের সুবিধা বাড়ে, কিন্তু সুখ কমে।
মসজিদে দেখি দুজন মুসল্লি। একজন দামী পোশাকে, গাড়িতে এসেছেন। অন্যজন সাধারণ পোশাকে, হেঁটে এসেছেন। কিন্তু নামাজে দুজনেই সমান। আল্লাহর কাছে জীবনযাত্রার মানের কোনো দাম নেই, জীবনের মানের দাম আছে।
আমার নিজের দিকে তাকালে দেখি, আমিও এই ফাঁদে পড়ি। আমি চাই বেশি উপার্জন, বড় বাড়ি, ভালো গাড়ি। কিন্তু এগুলো পেলেই কি আমার জীবন ভালো হবে? নাকি এগুলোর পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আমি জীবনের আসল সুখগুলো হারিয়ে ফেলব?
রাস্তায় দেখি একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুক। তার কাছে কিছুই নেই। কিন্তু যখন কেউ তাকে সামান্য কিছু দেয়, তার মুখে যে কৃতজ্ঞতার হাসি, সেটা অনেক ধনীর মুখে দেখি না।
হয়তো জীবনের আসল মান পরিমাপ হয় অন্যভাবে। কত মানুষ আমাকে ভালোবাসে? আমি কত শান্তিতে ঘুমাতে পারি? আমার হৃদয় কত পরিশুদ্ধ? আমি কতটা কৃতজ্ঞ? এগুলো কোনো টাকায় কেনা যায় না।
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, আমার উচিত জীবনযাত্রার মান আর জীবনের মানের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা। প্রয়োজনীয় সুবিধা চাওয়া ভুল নয়, কিন্তু সেগুলোকে জীবনের লক্ষ্য বানানো ভুল।
হয়তো সবচেয়ে ভালো জীবন সেটা যেখানে মানসম্পন্ন জীবনযাত্রা আছে, কিন্তু উচ্চমানের জীবনবোধও আছে। যেখানে প্রয়োজনীয় সুবিধা আছে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় লোভ নেই। যেখানে বস্তুগত উন্নতি আছে, কিন্তু আত্মিক অবনতি নেই।
কারণ শেষ বিচারে, আমরা যা কিনতে পারি সেটা আমাদের জীবনযাত্রার মান। কিন্তু আমরা যা হতে পারি, সেটাই আমাদের জীবনের মান।
একটু ভাবনা রেখে যান