
কফির কাপে তাকাও।
পানির উপরিভাগে একটা মুখ দেখা যায়।
বিকৃত। কম্পমান। অচেনা।
এই মুখ কার?
পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা।
ষোল বছর পর। বা কুড়ি। বা পঁচিশ। সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ না।
গুরুত্বপূর্ণ হলো — দুইজন মানুষ বসেছে। একজন আরেকজনকে চেনে বলে মনে করছে।
“তুই এখনো একই আছিস।”
এই বাক্যটা শুনেছ?
এই বাক্য একটা অভিযোগ। একটা স্বস্তি। একটা মিথ্যা।
একই।
কিন্তু কোন “একই”?
ষোল বছর আগের তুমি? নাকি তিরিশ বছর আগের? নাকি সেই তুমি যেটা তোমার বন্ধুর মাথায় আটকে আছে?
মানুষ বদলে যায়।
এই সত্যটা সবাই জানে।
কিন্তু কেউ মানতে চায় না।
কারণ যদি তুমি পরিবর্তন হও, তাহলে আমাদের বন্ধুত্বও পরিবর্তন হয়ে যায়।
এবং বন্ধুত্ব পরিবর্তন হলে, আমার পুরনো স্মৃতিও ভুল হয়ে যায়।
আমি যাকে মনে রেখেছি, সে আর নেই।
এই ভয়টা সহ্য করা যায় না।
তাই সবাই বলে — “তুই একই আছিস।”
দুটো চোখের দিকে তাকাও।
ষোল বছর পরে দেখা।
এই চোখ কি তুমি চেনো?
নাকি তোমার পুরনো স্মৃতিতে অন্য চোখ জমা আছে?
একবার এই মানুষ তোমার কাঁধে কেঁদেছিল।
তার কান্নার নোনা স্বাদ তোমার শার্টে লেগেছিল।
আজ সেই চোখ শুকনো। পরিকল্পিত। ব্যবসায়িক।
তুমি কি সেই কান্না দেখতে পাও?
না।
তাহলে এই মানুষ কে?
একটা প্রশ্ন করো।
“আমরা কি একসাথে বড় হয়েছি, নাকি পাশাপাশি আলাদা হয়েছি?”
দেখো কী হয়।
হাসি আসবে। অস্বস্তিকর হাসি।
তারপর বিষয় পরিবর্তন।
কারণ এই প্রশ্নটা একটা আয়না।
এবং আয়নায় যা দেখা যায়, সেটা কেউ দেখতে চায় না।
আসল প্রশ্ন কী?
আসল প্রশ্ন হলো — আমরা যখন বদলে যাওয়া শুরু করেছিলাম, তখন কি একে অপরকে সেই পরিবর্তনের অনুমতি দিয়েছিলাম?
না।
আমরা পাশাপাশি হেঁটেছি।
কিন্তু আলাদা পথে।
এবং এখন, ষোল বছর পরে, আমরা মনে করছি একই পথে ছিলাম।
মিথ্যা।
বন্ধুত্ব কী?
মানুষ বলে, বন্ধুত্ব মানে একসাথে থাকা।
ভুল।
বন্ধুত্ব মানে একে অপরের পরিবর্তনকে সাক্ষী হয়ে দেখা।
কিন্তু আমরা সাক্ষী হইনি।
আমরা অনুপস্থিত ছিলাম।
তুমি তোমার জীবনে ছিলে। আমি আমার জীবনে।
মাঝে মাঝে ফোন। মাঝে মাঝে বার্তা।
কিন্তু কখনো উপস্থিতি না।
এবং উপস্থিতি ছাড়া বন্ধুত্ব একটা ফটোগ্রাফ হয়ে যায়।
স্থির। পুরনো। জীবনহীন।
এখন কফি শপে বসে আছো।
তিনজন। বা চারজন। বা দুজন।
সবাই হাসছে।
কিন্তু হাসির নিচে একটা প্রতিরক্ষামূলক ভাব।
যেন একটা লুকানো অংশে কেউ হাত দিয়ে ফেলবে।
তাই আলাপ থাকে নিরাপদ।
“কেমন আছিস?”
“অফিস কেমন?”
“লেখালেখি চলছে?”
কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর কোনো আগ্রহ নেই।
এগুলো সামাজিক প্রোটোকল।
পুরাতন বন্ধুত্বের প্রোটোকল।
একটা অনুভূতি আসে।
মনে হয় তুমি একটা নাটক দেখছ।
তিনজন অভিনেতা অভিনয় করছে যে তারা পুরাতন বন্ধু।
আসল বন্ধুরা কবে মারা গেছে — কেউ জানে না।
আমরা শুধু তাদের ভূত।
তাদের নামে বসে আছি।
তাদের স্মৃতি নিয়ে কথা বলছি।
কিন্তু তারা নেই।
আমরাও নেই।
কেউ একটা নাম বলে।
“তার সাথে যোগাযোগ আছে?”
হ্যাঁ। ফেসবুকে। মাঝে মাঝে লাইক।
কিন্তু সেই মানুষটা কি তোমার চেনা মানুষ?
নাকি অন্য কেউ, যে একই নাম ব্যবহার করে?
মানুষ পরিবর্তন হলে — সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন হলে — তখন কি সে একই মানুষ থাকে?
নাকি নতুন একজন হয়ে যায়?
পরিবর্তন আর প্রতিস্থাপন — এক জিনিস না।
পরিবর্তন মানে একই গাছ, নতুন পাতা।
প্রতিস্থাপন মানে পুরো গাছ কেটে নতুন গাছ।
তোমার বন্ধু কি পরিবর্তন হয়েছে?
নাকি প্রতিস্থাপিত হয়েছে?
এবং তুমি?
একটা শিশু একবার জিজ্ঞেস করেছিল —
“আমি যদি সব কিছু ভুলে যাই, তাহলে আমি কি আর আমি থাকব?”
এই প্রশ্নের উত্তর কী?
যদি তোমার সব স্মৃতি চলে যায়, তুমি কি তুমি থাকবে?
যদি তোমার সব বিশ্বাস বদলে যায়, তুমি কি তুমি থাকবে?
যদি তোমার সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, তুমি কি তুমি থাকবে?
কোনটা তুমি?
স্মৃতি? বিশ্বাস? সম্পর্ক?
নাকি এসবের নিচে কিছু একটা আছে যেটা “তুমি”?
বিকেলের আলো কমে আসে।
উঠে দাঁড়াও।
আলিঙ্গন।
কিন্তু সেই আলিঙ্গনে কোনো উষ্ণতা নেই।
দুটো শরীর স্পর্শ করছে।
কিন্তু দুটো মানুষ মাইল দূরে।
প্রোগ্রামড স্পর্শ।
আনুষ্ঠানিকতা।
বিদায়ের নাটক।
বাড়ি ফেরো।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বুঝো —
বন্ধুত্ব আসলে আমাদের পুরাতন সংস্করণের বন্ধুত্ব।
নতুন আমরা এই বন্ধুত্বের অচেনা অতিথি।
যে মানুষগুলো ষোল বছর আগে একসাথে বসেছিল — তারা আর নেই।
যারা আজ বসেছে — তারা সেই ছায়ার সাথে কথা বলছে।
একটা পুরনো ছবির সাথে।
একটা মৃত স্মৃতির সাথে।
ঘরে ঢোকো।
কেউ জিজ্ঞেস করে, “কেমন লাগলো?”
কী বলবে?
বলবে — “ওরা আমার বন্ধু ছিল”?
ছিল।
Past tense.
এখন কী?
এখন ওরা তোমার বন্ধুদের স্মৃতি।
হয়তো এজন্যই জীবনে একা থাকা অনেক ভালো — কারণ একা থাকলে অন্তত নিজের পরিবর্তনটা নিজে দেখা যায়। কাউকে ব্যাখ্যা দিতে হয় না। কাউকে মিথ্যা বলতে হয় না।
রাতে বসে থাকো।
একটা প্রশ্ন আসে।
যদি তোমার বন্ধুরা তোমার পুরনো সংস্করণের বন্ধু হয়,
তাহলে তোমার পরিবার কি তোমার সাথে কথা বলছে?
নাকি তোমার পুরনো সংস্করণের সাথে?
তুমি কি জানো তুমি কে?
বর্তমানে?
এই মুহূর্তে?
নিজেকে চেনা — এই প্রশ্নটা আসলে সবচেয়ে কঠিন।
সবচেয়ে ভয়ানক প্রশ্ন হলো এই —
আমি কি আমার নিজের স্মৃতি হয়ে গেছি?
মানুষ আমার সাথে কথা বলে।
কিন্তু তারা কার সাথে কথা বলছে?
আমার সাথে?
নাকি তাদের মাথায় আটকে থাকা আমার একটা ছবির সাথে?
এবং আমি নিজে — আমি কি নিজেকে চিনি?
নাকি আমিও আমার নিজের একটা পুরনো ধারণার সাথে কথা বলছি?
কফির কাপে আবার তাকাও।
প্রতিবিম্ব এখনো আছে।
বিকৃত। কম্পমান। অচেনা।
এই মুখ কার?
হয়তো তোমার।
হয়তো না।
হয়তো এটা একটা মুখ যেটা তুমি পরে থাকো।
আসল মুখটা কোথাও হারিয়ে গেছে।
কখন?
কোথায়?
জানা নেই।
পরিবর্তন হওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া।
পুরনো তুমি মারা যায়।
নতুন তুমি জন্ম নেয়।
কিন্তু কেউ শোক করে না।
কেউ জানেই না যে একটা মৃত্যু হয়েছে।
তাই পুরনো তুমি ভুতের মতো ঘুরে বেড়ায়।
মানুষের স্মৃতিতে।
তোমার নিজের আয়নায়।
বন্ধুদের হাসিতে।
এবং সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য —
হয়তো কখনো কোনো “তুমি” ছিল না।
শুধু একটা সিরিজ।
একের পর এক সংস্করণ।
প্রতিটা মনে করে সে “আমি”।
কিন্তু সবাই আলাদা।
একটা চলে যায়।
আরেকটা আসে।
এবং কেউ টের পায় না।
নিঃসঙ্গতা মানে কি তাহলে এটাই? শুধু একা বসে থাকা না — বরং কাছের মানুষদের মাঝেও একা থাকা? স্বার্থপর বন্ধুদের সাথে বসে থেকেও ভীষণ একা লাগছে — কারণ তারা তোমার সাথে নেই, তোমার ছায়ার সাথে আছে।
বন্ধুত্ব তাই একটা সমাধিক্ষেত্র।
যেখানে পুরনো সংস্করণগুলো শুয়ে আছে।
এবং নতুন সংস্করণগুলো মাঝে মাঝে ফুল দিতে আসে।
কান্না করে।
স্মৃতিচারণ করে।
তারপর চলে যায়।
নিজের জীবনে।
নিজের পরিবর্তনে।
নিজের মৃত্যুতে।
একা থাকার কষ্ট আছে, নিঃসন্দেহে। কিন্তু জীবনে একা থাকা অনেক ভালো যখন বিকল্প হলো মিথ্যা সংযোগ — যেখানে তুমি আছো কিন্তু তোমাকে দেখা হচ্ছে না। শোনা হচ্ছে না। চেনা হচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত, হয়তো জীবনে একা থাকা অনেক ভালো — কারণ একাকীত্বে অন্তত সততা আছে। মিথ্যা নেই। ভান নেই। শুধু তুমি। যেই তুমি এই মুহূর্তে আছো। না পুরনো, না নতুন। শুধু এখনকার।

একটু ভাবনা রেখে যান