পুরনো কাগজপত্র দেখতে দেখতে একটা হিসাব করলাম। গত পাঁচ বছরে আমার জীবনে যত বিলম্ব হয়েছে, তার অর্ধেকের কারণ স্ট্যাম্প। দশ টাকার একটা স্ট্যাম্প না থাকায় মাসের পর মাস আটকে থেকেছি। আমার স্বপ্ন, আমার পরিকল্পনা, আমার ভবিষ্যৎ – সব আটকে গেছে একটুকরো কাগজের অভাবে।
আরাশের স্কুলে ভর্তির সময় একটা ২০ টাকার স্ট্যাম্প লাগবে বলেছিল। সেদিন ছুটির দিন ছিল, পোস্ট অফিস বন্ধ। ভর্তি দু’দিন দেরি হলো। ও পিছিয়ে গেল দু’দিন।
চাকরির জন্য আবেদন করতে গিয়ে ৫০ টাকার স্ট্যাম্প লাগল। পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখি ৫০ টাকার স্ট্যাম্প নেই। আছে ২০ আর ১০ টাকার। কিন্তু তারা বলল, “৫০ টাকার একটাই লাগবে।” আবেদনের শেষ তারিখ চলে গেল।
বাড়ির দলিল সত্যায়নের জন্য ১০০ টাকার স্ট্যাম্প লাগবে। পোস্ট অফিসে ১০০ টাকার স্ট্যাম্প নেই। বলল, “আগামী সপ্তাহে আসবে।” পরের সপ্তাহে গেলাম। আবার নেই। এভাবে দুই মাস কেটে গেল।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, এই ছোট্ট স্ট্যাম্প কেন এত বড় বাধা হয়?” কিন্তু মনে হয় আল্লাহর কাছেও হয়তো স্ট্যাম্প লাগে।
স্ট্যাম্প এত ছোট। কিন্তু এই ছোট্ট জিনিসটার অভাবে আমার বড় বড় কাজ আটকে থাকে। যেন আমার জীবনের ইঞ্জিন চালু করতে একটা ছোট্ট পার্টস লাগে। সেই পার্টস না পেলে পুরো ইঞ্জিন বন্ধ।
হ্যাপি বলে, “এত ছোট একটা জিনিসের জন্য এত চিন্তা কেন?” আমি বলি, “এই ছোট জিনিসটাই তো আমাদের আটকে রাখে।”
পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখি লম্বা লাইন। সবাই স্ট্যাম্পের জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ ২০ টাকার খোঁজে, কেউ ৫০ টাকার। আমরা সবাই এই ছোট্ট কাগজের টুকরোর দাস।
সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হলো, স্ট্যাম্প কিনতেও আবার স্ট্যাম্প লাগে। পোস্ট অফিসে একটা ফরম পূরণ করতে হয়। সেই ফরমে ১০ টাকার স্ট্যাম্প লাগে। স্ট্যাম্প কিনতে স্ট্যাম্প!
আমার মনে হয় এই দেশের সব স্ট্যাম্প কোনো গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখা আছে। যখন দরকার, তখন নেই। যখন দরকার নেই, তখন পাওয়া যায়।
একবার ভেবেছিলাম অনেক স্ট্যাম্প কিনে রাখব। কিন্তু পোস্ট অফিসে বলল, “একসাথে বেশি স্ট্যাম্প দেওয়া যায় না। নিয়ম আছে।” আবার নিয়ম!
আরাশ জিজ্ঞেস করেছিল, “আব্বু, এই স্ট্যাম্প দিয়ে কী হয়?” আমি বলেছিলাম, “এটা একটা প্রমাণ।” ও বলেছিল, “কীসের প্রমাণ?” আমি উত্তর দিতে পারিনি।
সত্যি তো, স্ট্যাম্প দিয়ে কী প্রমাণ হয়? যে আমি দশ টাকা দিতে পারি? যে আমি একটা স্ট্যাম্প কিনতে পারি? এইটুকু প্রমাণের জন্য আমার জীবন থেমে থাকে?
অফিসের লোকরা স্ট্যাম্প দেখে। দেখে কত টাকার। কোন রঙের। কোথায় লাগানো। সব ঠিক থাকলে বলে, “হ্যাঁ, এটা ঠিক আছে।” কিন্তু কী ঠিক আছে কেউ বলে না।
রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আমার জীবনের কত সময় স্ট্যাম্পের পেছনে নষ্ট হয়েছে। কত স্বপ্ন আটকে আছে স্ট্যাম্পের অভাবে।
আগামীকাল আবার পোস্ট অফিসে যেতে হবে। আবার সেই একই প্রশ্ন, “কত টাকার স্ট্যাম্প চাই?” আর সেই একই উত্তর, “নেই।”
আর আমার জীবনের গতি আরও একদিন থেমে থাকবে। একটা ছোট্ট স্ট্যাম্পের জন্য।
একটু ভাবনা রেখে যান