জীবন

দরজা

অক্টোবর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রাস্তায় একটা কুকুর দেখলে পা থামে। কেন? কারণ ছোটবেলায় একটা কুকুর তাড়া করেছিল। কামড়ায়নি। শুধু তাড়া করেছিল। কিন্তু সেই এক মুহূর্ত এখনো শরীরে আছে। ২৫ বছর পরেও। এটাই সত্য — যাকে বর্তমান মনে হয়, তার বেশিরভাগ আসলে অতীত।

প্রতিটা প্রতিক্রিয়া, প্রতিটা ভয়, প্রতিটা অভ্যাস — সব অতীতের লেখা প্রোগ্রাম। এবং সেই প্রোগ্রাম চলছে। অচেতনভাবে। প্রতিদিন।

ক্লাস ফাইভে একদিন কিছু বলা হয়েছিল। সবাই হেসেছিল। শিক্ষক বলেছিল — দার্শনিক হতে এসেছে। মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। সেদিনের পর কথা বলার আগে একটু থামার অভ্যাস হয়ে গেল। এখনো থামা হয়। কারণটা মনে নেই। কিন্তু সেই হাসি এখনো ভেতরে বাজে। সেই লজ্জা এখনো জ্বলছে। দরজাটা বন্ধ হয়নি।

কেউ মরার আগে বলেছিল — জানালা খুলে দে। জানালা খোলা হয়েছিল। বাইরে বিকেলের আলো। সে তাকিয়েছিল, তারপর চোখ বন্ধ করেছিল। এখন কেউ বিদায় নিলে জানালার দিকে তাকানো হয়। কেন, জানা নেই। কিন্তু তাকানো হয়। সেই মুহূর্ত একটা দরজা হয়ে গেছে। এবং সেই দরজা এখনো খোলা।

মানুষ ভাবে সে স্বাধীন। নিজের ইচ্ছায় চলছে। নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু আসলে সে একটা করিডোরে হাঁটছে। দুপাশে অসংখ্য দরজা। প্রতিটায় একটা পুরনো মুহূর্ত। এবং সেই মুহূর্তগুলো প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে — কখন থামতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে, কখন সরে যেতে হবে।

সবচেয়ে নিষ্ঠুর কথাটা হলো — কোন মুহূর্ত দরজা হবে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। একটা কুকুর তাড়া করল, সারাজীবন কুকুর ভয়। একটা হাসি শোনা গেল, সারাজীবন কথা বলার আগে থামা। একটা জানালা খোলা হলো, সারাজীবন বিদায়ের সময় জানালা। কেন এই মুহূর্তগুলোই? কেন অন্যগুলো না? মন বাছাই করে। কোন নিয়মে, কেউ জানে না।

এবং এই না-জানাটাই আসল বন্দিত্ব।

কিন্তু একটা সরু পথ আছে। বন্ধ করার না, জানার। কুকুর দেখে পা থামলে একটা প্রশ্ন করা যায় — এই কুকুর কি বিপজ্জনক, নাকি ২৫ বছর আগের সেই কুকুর এখনো তাড়া করছে? কথা বলার আগে থামলে জিজ্ঞেস করা যায় — এখন কি সত্যিই হাসবে কেউ, নাকি সেই পুরনো হাসি এখনো শোনা যাচ্ছে? এই প্রশ্নটুকুই পার্থক্য। অচেতন বন্দি আর সচেতন বন্দির মধ্যে।

সব দরজা বন্ধ হয় না। কিছু দরজা সারাজীবন খোলা থাকে। সেই ছয় বছরের ছেলে এখনো দৌড়াচ্ছে। সেই শিক্ষক এখনো হাসছে। সেই জানালা এখনো খোলা। এগুলো বদলানো যাবে না। কিন্তু এগুলো দেখা যায়।

আত্মজীবনী দর্শন সাহিত্য স্বপ্ন স্মৃতি

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

নীরবতা

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *