গতকাল সন্ধ্যায় সোফায় বসে ছিলাম। হ্যাপি রান্নাঘরে। তরকারি গরম করছে। চামচ পাতিলে ঠোকাঠুকি। আরাশ টিভির সামনে। কার্টুনে একটা বিড়াল একটা ইঁদুরের পেছনে ছুটছে।
আমি কিছু করছিলাম না। শুধু বসে।
হঠাৎ মনে হলো আমরা তিনজন তিনটা আলাদা দ্বীপ। একই ঘরে। কিন্তু আলাদা।
এটা কি জীবন?
সকালে লিফটে উঠলাম। রহিম সাহেব ঢুকলেন। তিনতলায় থাকেন। প্রতিদিন একসাথে লিফটে উঠি।
“আজকে আবার একই রুটিন,” তিনি বললেন।
আমি হাসলাম। “হ্যাঁ।”
লিফট নামছে। ২, ১, জি।
“আপনি কি কখনো ভাবেন,” আমি বললাম, “এই রুটিনের—”
লিফট খুলে গেল। রহিম সাহেব বেরিয়ে গেলেন। “চলেন, দেরি হয়ে যাবে।”
আমি থেমে গেলাম। প্রশ্নটা মুখে আটকে রইল।
অফিসে ঢুকতেই জামিউরের ফোন।
“চা খাবি?”
“কখন?”
“এখন। বের হ।”
দোকানে বসলাম। জামিউর সিগারেট ধরাল।
“ভাই, মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনটা চলে যাচ্ছে,” সে বলল। “কিন্তু কিছু হচ্ছে না।”
আমি চায়ে চুমুক দিলাম। “হ্যাঁ।”
“তুই কি বুঝছিস?”
“বুঝছি।”
“তাহলে?”
“তাহলে কী?”
জামিউর ধোঁয়া ছাড়ল। “আমরা কী করব?”
আমি জানালার দিকে তাকালাম। রাস্তায় মানুষ হাঁটছে। রিক্সা চলছে। একটা কুকুর ডাস্টবিনে নাক দিচ্ছে।
“জানি না,” আমি বললাম।
রাতে আরাশ বিছানায় শুয়ে বলল, “বাবা, আমরা কেন বেঁচে আছি?”
আমি তার পাশে বসলাম। “কেন জিজ্ঞেস করছ?”
“জানতে চাই।”
“ভালো কাজ করার জন্য,” আমি বললাম। “মানুষকে সাহায্য করার জন্য।”
আরাশ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কিন্তু তুমি কীভাবে জানো?”
“কী?”
“যে এটাই কারণ। তুমি কীভাবে জানো?”
আমি তার মাথায় হাত রাখলাম। “আমি… আমি জানি না জানি কি না।”
আরাশ আমার দিকে তাকাল। “মানে?”
“মানে হয়তো কেউ আমাকে বলেছিল। আর আমি বিশ্বাস করেছি।”
“কিন্তু এটা সত্যি?”
“জানি না বাবা।”
আরাশ চোখ বন্ধ করল। “তুমি অনেক কিছু জানো না বাবা।”
আমি হাসলাম। “হ্যাঁ। অনেক কিছুই না।”
বিদ্যুৎ চলে গেল। হ্যাপি মোমবাতি জ্বালাল। তিনজন বসলাম।
“এরকম সময়গুলো ভালো লাগে,” হ্যাপি বলল।
“কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“জানি না। শান্তি লাগে।”
আরাশ বলল, “আমারও ভালো লাগে। মোমবাতির আলো সুন্দর।”
আমি তাদের দিকে তাকালাম। মোমবাতির আলোতে তাদের মুখ। ছায়া পড়ছে দেয়ালে।
“তোমরা কি মনে করো,” আমি বললাম, “এই মুহূর্তটা—”
“বাবা, তুমি কেন এত প্রশ্ন করো?” আরাশ বলল।
হ্যাপি হাসল। “তোমার বাবার অভ্যাস।”
আমি চুপ করে রইলাম।
মৃদুল ফোন করল কানাডা থেকে।
“কেমন আছিস?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“ভালো। মানে… ঠিক আছি।”
“শুনে ভালো মনে হচ্ছে না।”
“ভাই, এখানে অনেক সুবিধা। কিন্তু মনটা…”
“মনটা কী?”
“খারাপ থাকে। জানি না কেন।”
“তুই কি ভেবেছিলিস যাওয়ার পর সব ঠিক হয়ে যাবে?”
মৃদুল চুপ করে রইল। তারপর বলল, “হ্যাঁ। সেরকমই ভেবেছিলাম।”
“আর এখন?”
“এখন মনে হয় যেখানে যাই, আমি তো আমিই থাকি।”
“হ্যাঁ।”
“আর তুই? ভালো আছিস?”
“জানি না। হয়তো তোর মতোই।”
মৃদুল হাসল। “আমরা সবাই একই রকম।”
শুক্রবার জুমার নামাজে গেলাম। ইমাম সাহেব খুতবা দিচ্ছেন।
“আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত।”
আমি মন দিয়ে শুনলাম। পাশে একজন বুড়ো মানুষ ঘুমাচ্ছেন। তার মাথা নিচু হয়ে আসছে, আবার উঠছে।
“আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাকে ডাকার জন্য।”
আমার মনে প্রশ্ন জাগল। কিন্তু প্রশ্নটা কী জানি না।
নামাজ শেষ হলো। বাইরে এসে একজন বলল, “আজকের খুতবা ভালো ছিল।”
“হ্যাঁ,” আমি বললাম।
কিন্তু আমি ভাবছিলাম অন্য কিছু।
মায়ের কথা মনে পড়ল। মারা যাওয়ার কয়েক মাস আগে বলেছিলেন, “সন্তানদের জন্য বেঁচে আছি।”
আমি তখন বলেছিলাম, “আপনি নিজের জন্যও বাঁচেন আম্মা।”
তিনি হেসেছিলেন। “নিজের জন্য কী আছে?”
আমি উত্তর দিতে পারিনি।
এখন মাঝে মাঝে ভাবি, তিনি কি সত্যিই বিশ্বাস করতেন? নাকি এটা বলা একটা অভ্যাস ছিল?
আমার জন্য কী আছে? হ্যাপি? আরাশ? কাজ?
নাকি এগুলো আমি বেছে নিয়েছি কারণ অন্য কিছু ছিল না?
সাইফুল কবিরের সাথে দেখা হলো।
“কেমন আছিস?” সে জিজ্ঞেস করল।
“আছি।”
“তুই জানিস, আমার মনে হয় আমরা একটা বিশেষ কারণে এসেছি।”
“কী কারণ?”
“সেটাই তো বের করতে হবে।”
আমি তার দিকে তাকালাম। “তুই কি খুঁজছিস?”
“হ্যাঁ। তুই না?”
“জানি না। হয়তো।”
সাইফুল হাসল। “তুই সবসময় জানিস না বলিস।”
“কারণ আমি সত্যিই জানি না।”
“কিন্তু না জানাটাও তো একটা উত্তর।”
আমি চুপ করে রইলাম।
দেয়া বোন ফোন করল।
“ভাইয়া, আমার বিয়ের বার্ষিকী আজ।”
“অনেক শুভেচ্ছা।”
“ধন্যবাদ। জানেন, বিয়ের আগে মনে হতো কিছু একটা নেই। এখন মনে হয় পেয়ে গেছি।”
“কী পেয়েছ?”
“জানি না। একটা… একটা পূর্ণতা।”
আমি হাসলাম। “ভালো কথা।”
“আপনার কি মনে হয় না?”
“কীসের?”
“পূর্ণতা? আপনার কি মনে হয় আপনার জীবন পূর্ণ?”
আমি থেমে গেলাম। “জানি না দেয়া। মাঝে মাঝে মনে হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় না।”
“তাহলে?”
“তাহলে হয়তো পূর্ণতা একটা মুহূর্ত। সবসময়ের জিনিস না।”
দেয়া চুপ করে রইল।
বড় ভাই আলাদা হয়ে গেল সেই কবে। পাঁচ বছর হয়ে গেল।
প্রথমদিকে মনে হতো পরিবারটা ভেঙে গেছে। আমাদের যা ছিল সব শেষ।
এখন মনে হয় আসলে কী ছিল? আমরা একসাথে থাকতাম। কিন্তু একসাথে থাকা কি একটা অর্থ?
গত ঈদে বড় ভাই এসেছিল। চা খেয়েছিল। চলে গিয়েছিল।
“আগের মতো নেই,” হ্যাপি বলেছিল।
“হ্যাঁ।”
“তুমি কি মিস করো?”
“কী?”
“আগের পরিবারটা।”
আমি ভেবেছিলাম। “জানি না। আগের পরিবারটা আসলে কী ছিল সেটাই তো মনে পড়ছে না।”
রাতে আরাশ ঘুমিয়ে গেছে। তার কপালে চুমু দিলাম।
মুহূর্তটা ভালো লাগল। নরম। শান্ত।
এই ভালোলাগাটা কোথা থেকে এল?
আমি কি এটা তৈরি করলাম? নাকি এটা ছিল আর আমি শুধু অনুভব করলাম?
হ্যাপি পাশে শুয়ে বইপড়ছিল। “কী ভাবছ?”
“কিছু না।”
“তুমি সবসময় কিছু না ভাবছ বলো। কিন্তু ভাবছ।”
আমি হাসলাম। “ঠিক বলেছ।”
“তাহলে বলো। কী ভাবছ?”
“ভাবছি… আমাদের এই জীবনটা। এই ঘরটা। এই মুহূর্ত। এটা কি আছে? নাকি আমরা বানাচ্ছি?”
হ্যাপি বই নামিয়ে রাখল। “তুমি অনেক কঠিন প্রশ্ন করো।”
“জানি। কিন্তু উত্তর পাই না।”
“হয়তো উত্তর নেই।”
“তাহলে কী আছে?”
হ্যাপি আমার হাত ধরল। “আমরা আছি। আরাশ আছে। এই ঘর আছে। এইটুকু কি যথেষ্ট না?”
আমি তার হাত চেপে ধরলাম। “জানি না। হয়তো।”
পরদিন সকালে অফিসে রহিম সাহেবের সাথে আবার লিফটে।
“আজকেও একই রুটিন,” তিনি বললেন।
“হ্যাঁ।”
“আপনি কি এটা নিয়ে ভাবেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“কী নিয়ে?”
“রুটিন নিয়ে। এই যে প্রতিদিন একই কাজ।”
রহিম সাহেব হাসলেন। “আগে ভাবতাম। এখন আর না।”
“কেন?”
“কারণ ভাবলে কাজ হয় না। কাজ করতে হয়।”
লিফট খুলে গেল। তিনি বেরিয়ে গেলেন।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
দুপুরে জামিউর আবার ফোন করল।
“চা খাবি?”
“খাব।”
আবার সেই দোকানে বসলাম। আবার চা। আবার সিগারেটের ধোঁয়া।
“শোন,” জামিউর বলল, “আমি ঠিক করেছি একটা কাজ শুরু করব।”
“কী কাজ?”
“জানি না। কিছু একটা। কারণ এভাবে তো চলতে পারে না।”
“কেন চলতে পারে না?”
“কারণ… কারণ জীবনের একটা মানে থাকা উচিত।”
আমি চায়ে চুমুক দিলাম। “তুই কি মনে করিস মানে কোনো কাজে?”
“হ্যাঁ। তুই না?”
“জানি না। হয়তো মানে মুহূর্তে।”
“মানে?”
“এই যে আমরা বসে চা খাচ্ছি। এটাও তো একটা মানে।”
জামিউর হাসল। “তুই ফিলোসফি করছিস।”
“না। আমি শুধু ভাবছি।”
রাতে নামাজ পড়লাম। সিজদায় মাথা রাখলাম।
“আল্লাহ, আমি কী চাই?”
উত্তর এল না।
“আমি কি কিছু খুঁজছি? নাকি তৈরি করছি?”
আবার নীরবতা।
“নাকি আমি শুধু বেঁচে আছি?”
আমি উঠলাম। বসে রইলাম।
হয়তো প্রশ্নগুলোই উত্তর।
গভীর রাতে হ্যাপি ঘুমিয়ে গেছে। আরাশ ঘুমিয়ে গেছে। আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।
বাইরে অন্ধকার। একটা কুকুর ডাকছে। দূরে একটা গাড়ির শব্দ।
আমি কি জানি কেন আমি বেঁচে আছি?
না।
আমি কি জানি আমার জীবনের অর্থ কী?
না।
কিন্তু আমি বেঁচে আছি। হ্যাপির পাশে ঘুমাব। সকালে আরাশকে স্কুলে পাঠাব। অফিসে যাব। জামিউরের সাথে চা খাব।
এগুলো কি অর্থ?
জানি না।
কিন্তু এগুলোই আছে।
হয়তো এটুকুই।
একটু ভাবনা রেখে যান