
মানুষ মরে না একবারে।
মানুষ ধীরে ধীরে ভুল হয়ে যায়।
প্রথমে মৃত্যু। তারপর স্মৃতি। তারপর গল্প। তারপর একটা ঝাপসা ধারণা। তারপর কিছুই না।
মৃত্যুবার্ষিকীতে সবাই বসে। সবাই কথা বলে। কিন্তু সবার কথা আলাদা। একজন বলে স্নেহ। একজন বলে কঠোরতা। একজন বলে ছাদের গল্প।
তিনজন মানুষ। তিনটা আলাদা মৃত।
কোনটা সত্য? কেউ জিজ্ঞেস করে না। কারণ প্রশ্নটা ভয়ের।
সত্য হলো — কেউ কাউকে চেনে না।
মানুষ ভাবে সে চেনে। বছরের পর বছর একসাথে থেকেছে। খাবার খেয়েছে। ঘুমিয়েছে। তবু চেনে না। কারণ মানুষ দেখে না। মানুষ দেখতে চায় যা — সেটাই দেখে।
মানুষ আয়না না। মানুষ ক্যানভাস। প্রত্যেকে নিজের ছবি আঁকে তার উপর।
শিশু জিজ্ঞেস করে, “মারা গেলে মানুষ কোথায় যায়?”
উত্তর আসে — “স্বর্গে।”
এটা উত্তর না। এটা পালানো।
স্বর্গ হলো মানুষের সবচেয়ে পুরনো মিথ্যা। যে মিথ্যা মানুষ নিজেই বানিয়েছে। কারণ সত্য সহ্য করার ক্ষমতা নেই।
সত্য হলো — চলে গেলে শেষ। শুধু গল্প থাকে। এবং গল্প মানুষ না।
পুরনো ছবি বের হয়। সাদা-কালো। মানুষ দাঁড়িয়ে। হাসছে না। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে।
এই ছবিতে কী আছে? একটা সেকেন্ড। একটা আলো। একটা পোজ।
মানুষটা নেই। মানুষটা কখনো ছিল না ছবিতে।
অথচ ছবি দেখে মানুষ ভাবে — এই সে।
মানুষ একটা গাছ লাগায়। ভাবে — এটা থাকবে। থাকবে। কিন্তু গাছ জানবে না কে লাগিয়েছে। গাছের জানার দরকার নেই। গাছ বাঁচে। মানুষ মরে।
একদিন কেউ বলবে, “ওই লোক আম গাছ লাগিয়েছিলেন।”
এটাই পরিচয়।
পুরো জীবন। হাজার রাত। হাজার চিন্তা। লাখো মুহূর্ত। শেষে একটা লাইন।
মানুষ এইটুকু।
মানুষ ভাবে তার পরিচয় আছে। তার identity আছে। সে জানে সে কে।
মিথ্যা।
পরিচয় হলো অন্যরা যা মনে রাখে। এবং অন্যরা ভুল মনে রাখে। সবসময়।
মানুষ কয়জনের কাছে কয়জন আলাদা। ঘরে আলাদা। বাইরে আলাদা। একা থাকলে আলাদা। তাহলে আসল কোনটা?
কোনোটা না।
মানুষ হলো একটা ধারণা। যে ধারণা প্রতিটা সম্পর্কে বদলায়। কোনো আসল “আমি” নেই। এটা শুনতে ভয়ের। কারণ মানুষ এই প্রশ্নটাকে এড়িয়ে যায় সারাজীবন।
একদিন একটা ছবি হবে। বাক্সে থাকবে। আলমারিতে। অন্ধকারে।
কেউ বের করবে। জিজ্ঞেস করবে — “এই কে?”
হয়তো কেউ বলবে। হয়তো কেউ বলবে না। হয়তো ছবিটা পড়ে থাকবে। নামহীন।
এটাই শেষ। এটাই সত্য।
মানুষ একা আসে। একা যায়। মাঝখানে যা — সব ছায়া। আলো নিভলে ছায়া যায়।
শুধু একটা ছবি থাকে। সাদা-কালো। বাক্সে।
এবং একদিন সেটাও হারায়।

একটু ভাবনা রেখে যান