ব্লগ

শেষ হিসাবের খাতা

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার

শেষ হিসাব

নিঃশ্বাস গোনা শুরু করেছি। একশো পঁচানব্বই। একশো চুরানব্বই। একশো তিরানব্বই। প্রতিটি নিঃশ্বাস এখন একটা বিলাসিতা — যা ছিল সারাজীবন এত সহজ, এত স্বাভাবিক যে কখনো খেয়ালও করিনি, সেটাই এখন সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। প্রতিটি শ্বাসের সাথে একটা হিসাব মিলিয়ে নিচ্ছি — সেই হিসাব যা সারাজীবন এড়িয়ে গেছি, ব্যস্ততার অজুহাতে ফেলে রেখেছি, আর এখন যখন সময় প্রায় শেষ, তখন করতে বসেছি। কী করেছি জীবনে? কী করিনি? কী পেয়েছি? কী হারিয়েছি? এই প্রশ্নগুলো এখন আর দার্শনিক নয় — এগুলো এখন জরুরি, এখন চূড়ান্ত।

আরাশ এসে আমার হাত ধরল। তার হাতের উষ্ণতা আমার ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে আসা আঙুলে — যেন দুটো পৃথিবীর সংযোগ, জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে একটা সেতু। সে এখন চল্লিশ, তার চোখে সেই একই দুশ্চিন্তা যা আমার চোখে ছিল যখন আমার বাবা এভাবে শুয়েছিলেন। চক্রটা সম্পূর্ণ হচ্ছে। সে জিজ্ঞেস করল, কণ্ঠে একটা কাঁপুনি যা সে লুকাতে চাইছে কিন্তু পারছে না, “বাবা, ভালো আছেন?” ভালো। শব্দটার মানে এখন সম্পূর্ণ আলাদা। সারাজীবন ভালো মানে ছিল সুস্থ, সচল, কর্মক্ষম। এখন ভালো মানে এখনো ব্যথা পাচ্ছি — কারণ ব্যথা মানে এখনো অনুভব করতে পারছি, এখনো জীবিত আছি। ভালো মানে এখনো আরাশের হাতের উষ্ণতা টের পাচ্ছি, হ্যাপির কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছি, জানালা দিয়ে আসা আলো দেখতে পাচ্ছি।

হ্যাপি দাঁড়িয়ে আছে বিছানার পাশে। তার চোখ লাল — কতক্ষণ ধরে কাঁদছে জানি না, হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, হয়তো দিনের পর দিন। আমি তাকে কষ্ট দিয়েছি। এই উপলব্ধিটা এখন স্পষ্ট, কোনো অজুহাত ছাড়া। জীবনভর দিয়েছি — কখনো রাগ করে, কখনো উপেক্ষা করে, কখনো নিজেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে। সেই রাতগুলোর কথা মনে পড়ে যখন অফিসের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে তার কথা শুনিনি। সেই সন্ধ্যাগুলোর কথা মনে পড়ে যখন সে কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু আমি ক্লান্ত ছিলাম। এখনো কষ্ট দিচ্ছি — এই মৃত্যু দিয়ে, এই চলে যাওয়া দিয়ে, এই একা ফেলে রেখে যাওয়া দিয়ে। কিন্তু এই কষ্ট দেওয়াটাও কি ভালোবাসার অংশ নয়? যাকে ভালোবাসি তাকে কষ্ট না দিয়ে কি থাকা যায়? ভালোবাসা মানেই তো ঝুঁকি নেওয়া — হারানোর ঝুঁকি, কষ্ট পাওয়ার ঝুঁকি, কষ্ট দেওয়ার ঝুঁকি।

ডাক্তার বলেছে সময় কম। কয়েক ঘণ্টা, হয়তো একটা দিন, বেশি হলে দুই। কিন্তু এই কথা শুনে আমি অবাক হইনি। কারণ সময় তো সবসময়ই কম ছিল — শুধু জানতাম না। বিশ বছর বয়সে মনে হতো অনন্তকাল হাতে আছে। ত্রিশে মনে হতো এখনো অনেক সময় বাকি। পঞ্চাশে প্রথম টের পেলাম বালি ফুরিয়ে আসছে। আর এখন? এখন জানি — সময় সবসময়ই কম ছিল, আমরা শুধু গুনতে জানতাম না।

চোখ বন্ধ করলে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। হাসপাতালের এই সাদা ঘর মিলিয়ে যায়, বদলে আসে পুরনো বাড়ির বারান্দা। আমি আট বছরের বাচ্চা। দাদুর কোলে বসে আছি, তাঁর লুঙ্গির গন্ধ নাকে, তাঁর দাড়ির খোঁচা গালে। তিনি বলছেন, সেই গভীর গলায় যা এখনো কানে বাজে, “মানুষ মরে না, বাবা। মানুষ পাল্টায়। এক রূপ থেকে আরেক রূপে যায়।” তখন বুঝিনি — মনে হয়েছিল বুড়োদের এলোমেলো কথা। এখন বুঝি। আমার এই শরীর — যা সত্তর বছর ধরে আমাকে বহন করেছে, যার হাত দিয়ে আরাশকে প্রথম ধরেছি, যার ঠোঁট দিয়ে হ্যাপিকে প্রথম চুমু খেয়েছি — এই শরীর শেষ হবে। মাটিতে মিশে যাবে, ধুলো হয়ে যাবে। কিন্তু আরাশের মধ্যে আমার কিছু থেকে যাবে। আমার হাসির ধরন — যখন সে হাসে, মাঝে মাঝে হ্যাপি বলে, “একদম তোমার বাবার মতো।” আমার রাগের ধরন — যখন সে রেগে যায়, আমি চিনতে পারি সেই একই অধৈর্য যা আমার ছিল। আমার ভালোবাসার ধরন — নিঃশব্দ, প্রকাশহীন, কিন্তু গভীর। এ কেমন অমরত্ব — দেহ নেই, কিন্তু কিছু একটা রয়ে যাচ্ছে, প্রবাহিত হচ্ছে, বয়ে চলেছে।

জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কী করেছি? এই প্রশ্নটা এখন জ্বলজ্বল করছে। চাকরি? চল্লিশ বছর একই অফিসে, অসংখ্য ফাইল, অসংখ্য মিটিং — সব এখন ধূসর, অর্থহীন। টাকা-পয়সা? যা আছে তা হ্যাপি আর আরাশের জন্য রেখে যাচ্ছি, কিন্তু টাকা তো জীবনের মাপকাঠি নয়। না, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ অন্য কিছু। আরাশকে জন্ম দিয়েছি। একটা মানুষ তৈরি করেছি — যে এখন দাঁড়িয়ে আছে আমার পাশে, যার নিজের সন্তান আছে, যে আমার পর এই পৃথিবীটা চালিয়ে নেবে। এই ধারাবাহিকতা — দাদু থেকে বাবা, বাবা থেকে আমি, আমি থেকে আরাশ, আরাশ থেকে তার ছেলে — এটাই হয়তো জীবনের আসল অর্থ।

হ্যাপির হাত আমার কপালে। ঠান্ডা, নরম, পরিচিত। এই হাত আমাকে স্পর্শ করেছে হাজার বার — রাগে, ভালোবাসায়, যত্নে, ক্লান্তিতে। সে বিড়বিড় করছে, কানের কাছে মুখ এনে, “তুমি ভালো স্বামী ছিলে।” আমি ভাবি — ভালো স্বামী? সত্যি? নাকি শুধু যতটুকু পেরেছি ততটুকু? পার্থক্যটা এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ভালো মানে নিখুঁত নয় — নিখুঁত কেউ হতে পারে না। ভালো মানে চেষ্টা করা। প্রতিদিন উঠে আবার চেষ্টা করা। ঝগড়ার পর ক্ষমা চাওয়া। ভুলের পর শোধরানোর চেষ্টা করা। আমি চেষ্টা করেছি। সবসময় পারিনি, অনেকবার ব্যর্থ হয়েছি, কিন্তু চেষ্টা থামাইনি। এটুকুই হয়তো যথেষ্ট।

রুমের বাইরে শুনতে পাই জীবনের শব্দ। হাসপাতালের করিডোরে পায়ের আওয়াজ। দূরে কোথাও একটা শিশুর কান্না — হয়তো এইমাত্র জন্ম নিয়েছে, হয়তো তার প্রথম নিঃশ্বাস যখন আমার শেষ নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসছে। জানালার বাইরে গাড়ির হর্ন, মানুষের কথাবার্তা, কোথাও একটা কুকুরের ডাক। জীবন থেমে নেই আমার জন্য। থামবেও না। আমি চলে গেলে পৃথিবী ঘুরবে, সূর্য উঠবে, মানুষ হাসবে-কাঁদবে। এই উপলব্ধিটা কষ্টের — কারণ আমি এত গুরুত্বহীন? নাকি স্বস্তির — কারণ জীবন চলতে থাকবে, আমার অনুপস্থিতিতেও? দুটোই। দুটো অনুভূতি একসাথে, মিশে আছে, আলাদা করা যাচ্ছে না।

ছোটবেলায় মৃত্যুকে ভাবতাম একটা বিরাট ব্যাপার। সিনেমায় যেমন দেখাতো — নায়ক মরলে পৃথিবী কেঁপে ওঠে, আকাশে বজ্রপাত হয়, সবাই বুক চাপড়ে কাঁদে। এখন জানি মৃত্যু খুবই সাধারণ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মরছে — এই মুহূর্তেও কেউ না কেউ শেষ নিঃশ্বাস ফেলছে। প্রকৃতির নিয়ম, জীবনের অংশ, এড়ানোর উপায় নেই। তাহলে আমার এই একটি জীবনের মূল্য কী? কেন এই সত্তর বছর গুরুত্বপূর্ণ?

মূল্য এই যে আমি ছিলাম। এই মহাবিশ্বে, এই গ্রহে, এই সময়ে — আমি ছিলাম। ভালোবেসেছি এমন একজনকে যে আমাকেও ভালোবেসেছে। ভুল করেছি অসংখ্য, কিছু ক্ষমা পেয়েছি, কিছু পাইনি। শিখেছি — ধীরে ধীরে, কষ্ট পেয়ে পেয়ে, হেঁটে হেঁটে। আরাশকে সাইকেল চালাতে শেখাতে পেরেছি। সেই দিনটার কথা মনে পড়ে — রোববার সকাল, পার্কের রাস্তা, আমি পেছনে দৌড়াচ্ছি সাইকেল ধরে, তারপর ছেড়ে দিলাম, আর সে নিজে নিজে পেডেল মারল, প্রথমবার, একা একা। তার মুখে সেই মুহূর্তে যে আনন্দ ছিল — সেই দৃশ্যটা, সেই হাসিটা, সেই বিস্ময়টা — এই মহাবিশ্বে আগে কখনো ঘটেনি, পরেও ঘটবে না। এই অনন্যতাই আমার অবদান। এই একটি মুহূর্ত তৈরি করা।

হ্যাপির সাথে প্রথম রাতের কথা মনে পড়ে। কতটা অস্বস্তি ছিল দুজনেরই। কতটা অচেনা ছিলাম একে অপরের কাছে। তারপর কীভাবে আস্তে আস্তে, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, এক হয়ে গেছি। দুটো আলাদা মানুষ, দুটো আলাদা পৃথিবী থেকে আসা, কীভাবে একটা যৌথ পৃথিবী তৈরি করেছি। প্রেম একটা কাজ — এই সত্যটা বুঝতে অনেক বছর লেগেছে। প্রেম শুধু অনুভূতি নয়, প্রেম প্রতিদিনের পরিশ্রম। প্রতিদিন সকালে উঠে সিদ্ধান্ত নেওয়া যে আজও এই মানুষটার পাশে থাকব। আমি সেই কাজ করেছি। পুরো জীবন।

নিঃশ্বাস আরও কষ্টকর হচ্ছে। বুকে একটা চাপ, যেন কেউ বসে আছে। কিন্তু ভয় নেই। অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি — ভয় নেই। কারণ এই কষ্টটাও একটা অভিজ্ঞতা। শেষ অভিজ্ঞতা। জীবনের শেষ উপহার। আমার হিসাবের খাতায় লেখা থাকবে — একজনকে ভালোবেসেছি জীবনভর, ছেড়ে দিইনি কখনো। একটা সন্তান বড় করেছি, তাকে মানুষ হতে দেখেছি। কিছু বন্ধু ছিল যারা মনে রাখবে, অন্তত কিছুদিন। কিছু ভুল করেছি, কিছু শুধরেছি। বেঁচে ছিলাম — পুরোপুরি, সততায়, ভয়ে, সাহসে, সবকিছু নিয়ে। শেষ হিসাবে এটুকুই যথেষ্ট। এর বেশি কিছু লাগে না।


এই লেখাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। জীবনের শেষ মুহূর্তে মানুষ কী ভাবে, কী অনুভব করে — সেই কল্পনা থেকে লেখা। আমি এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাইনি। তবু লিখতে গিয়ে মনে হলো, হয়তো সেই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় — কাকে ভালোবেসেছি, কী রেখে যাচ্ছি, কতটুকু বেঁচেছি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *