ব্লগ

আয়নায় দুই মুখ

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুটি মুখ দেখি। একটি পঁচিশ বছরের — চোখে আগুন জ্বলছে, সেই আগুন যা পোড়ায় সব বাধা, সব সীমানা, সব ‘অসম্ভব’ শব্দকে; ঠোঁটে বিজয়ের হাসি, যেন পৃথিবী ইতিমধ্যেই জয় করে ফেলেছে, বাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতা। আরেকটি মুখ সাঁইত্রিশের — চোখে জমে আছে বারো বছরের ক্লান্তি, হাজার রাতের অনিদ্রা, অসংখ্য আপসের ছায়া; ঠোঁটে ঝুলে আছে এমন প্রশ্ন যার উত্তর হয়তো কোনোদিন পাওয়া যাবে না। এই দুই মুখ একই আয়নায়, একই ফ্রেমে, কিন্তু তাদের মধ্যে দূরত্ব আলোকবর্ষের — সময়ের আলোকবর্ষ, অভিজ্ঞতার আলোকবর্ষ, হারানো বিশ্বাসের আলোকবর্ষ।

পঁচিশ বছরের আমি বলে ওঠে, গলায় সেই তরুণ দাম্ভিকতা যা শুধু তারাই বহন করতে পারে যারা এখনো হারেনি: “আমি পারব। সব পারব। যা চাইব তাই পাব।” সাঁইত্রিশের আমি শোনে, একটু হাসে — সেই হাসি যা হাসে তারা যারা জানে জীবন কতটা নির্মম হতে পারে — তারপর বলে: “আমি পারিনি। অনেক কিছুই পারিনি।” কিন্তু কে আসলে পারেনি? আর ঠিক কী পারিনি? সাফল্য? কিন্তু সাফল্যের সংজ্ঞা কে লিখেছে? সুখ? কিন্তু সুখ কি একটা গন্তব্য নাকি একটা যাত্রাপথ? নাকি পারিনি সেই মানুষটা হতে যে হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম পঁচিশে?

একদিনের কথা মনে পড়ে। রাতের খাবারের টেবিল। মা ভাত বাড়ছেন, বাবা কোনো একটা খবরের কাগজ পড়ছেন। হঠাৎ বাবা কাগজ নামিয়ে রেখে আমার দিকে তাকালেন — সেই দৃষ্টি যা বাবারা দেয় যখন তারা জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সত্য বলতে চায় — এবং বললেন: “জীবনটা সহজ নয়, বাবা। যত তাড়াতাড়ি বুঝবি, তত ভালো।” পঁচিশ বছরের আমি মনে মনে হেসেছিলাম। সেই হাসি যা হাসে তারা যারা মনে করে বড়রা কিছুই বোঝে না, পুরনো প্রজন্ম পুরনো চিন্তায় আটকে আছে। ভেবেছিলাম: “তোমার জীবন হয়তো সহজ নয়, বাবা। তুমি হয়তো পারোনি। কিন্তু আমি আলাদা। আমার জীবন অন্যরকম হবে। আমি সেই নিয়মের ব্যতিক্রম যা তোমাকে হারিয়ে দিয়েছে।”

আজ সেই একই টেবিলে বসে আছি। মা নেই আর, বাবা আছেন কিন্তু অনেক বুড়ো হয়ে গেছেন। আর আমার সামনে বসে আছে আরাশ — এগারো বছরের ছেলে, চোখে সেই একই আগুন যা আমার চোখে ছিল একদিন, ঠোঁটে সেই একই অব্যক্ত অহংকার। আমি তার দিকে তাকাই, আর আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে সেই একই কথা, সেই একই সুরে, যেন বাবার কণ্ঠ আমার গলা দিয়ে কথা বলছে: “জীবনটা সহজ নয়, বাবা।” আর আরাশের চোখে দেখি সেই একই গোপন হাসি — সে-ও ভাবছে আমি বুঝি না, সে-ও ভাবছে সে আলাদা।

এই কি তাহলে মানবজীবনের অমোঘ চক্র? বাবার অভিজ্ঞতা আমি মানিনি, কারণ মনে করেছিলাম অভিজ্ঞতা হস্তান্তরযোগ্য নয়। আরাশও আমার অভিজ্ঞতা মানবে না, কারণ সে-ও মনে করবে একই কথা। প্রতিটি প্রজন্ম একই ভুল করবে, একই দেয়ালে মাথা ঠোকাবে, একই ক্ষত নিয়ে ফিরে আসবে। আর তারপর পরের প্রজন্মকে সাবধান করবে — যে সাবধানবাণী কেউ শুনবে না।

যৌবনের অহংকার ছিল নিরেট হীরার মতো — কোনো খাদ নেই, কোনো ফাটল নেই, কোনো সন্দেহের ছায়া নেই। আমি জানতাম — না, জানতাম না, বিশ্বাস করতাম এমন দৃঢ়ভাবে যে সেটা জানার চেয়েও বেশি সত্য মনে হতো — আমি জানতাম আমি কী চাই। জানতাম কীভাবে পাব। জানতাম পৃথিবী আমার জন্য অপেক্ষা করছে, লাল গালিচা বিছিয়ে, ফুল ছড়িয়ে। “আমি তিরিশের মধ্যে সফল হব” — এই বাক্যটি তখন ছিল জীবনের মৌলিক সত্য, গাণিতিক সূত্রের মতো অবধারিত। “আমি কখনো আপস করব না” — এই প্রতিজ্ঞা ছিল পাথরে খোদাই করা। “আমি আলাদা, আমি সাধারণ মানুষদের মতো নই” — এই বিশ্বাস ছিল আমার পরিচয়ের ভিত্তি।

মধ্যবয়সের অনুশোচনা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রাণী। এটা হঠাৎ আসে না, বজ্রপাতের মতো নয়। এটা আসে ধীরে, কুয়াশার মতো — প্রথমে টের পাওয়া যায় না, তারপর হঠাৎ দেখো চারদিক ঢেকে গেছে। এটা নিঃশব্দ — দিনের আলোয় লুকিয়ে থাকে, কিন্তু রাতে, যখন সবাই ঘুমায়, তখন এসে বসে বুকের ওপর। “আমি কি যথেষ্ট চেষ্টা করেছি?” — এই প্রশ্ন জেগে ওঠে রাত তিনটায়। “আমি কি ভুল পথে এসেছি? নাকি ঠিক পথেই এসেছি, কিন্তু যথেষ্ট দূর হাঁটিনি?” “আমি কি আসলেই আলাদা ছিলাম, নাকি সেটাও একটা মিথ্যা ছিল যা নিজেকে বলতাম?”

অনুশোচনা কোনো বড় ব্যর্থতা নিয়ে নয়। আমি পথে বসে যাইনি, অপরাধী হইনি, সবকিছু হারাইনি। অনুশোচনা ছোট ছোট আপসের জন্য — সেই মিটিংয়ে যখন জানতাম বসের কথা ভুল কিন্তু চুপ করে ছিলাম। সেই সন্ধ্যায় যখন আরাশ খেলতে চেয়েছিল কিন্তু আমি ক্লান্ত ছিলাম। সেই রাতে যখন হ্যাপি কথা বলতে চেয়েছিল কিন্তু আমি ফোনে ব্যস্ত ছিলাম। প্রতিদিনের এই সামান্য পিছিয়ে যাওয়া — এক মিলিমিটার করে — বছরের পর বছর জমে জমে মাইল হয়ে গেছে।

অফিসের জানালার পাশে বসে কখনো কখনো ভাবি — পঁচিশ বছরের আমি যদি টাইম মেশিনে চড়ে এসে এই জীবন দেখত, কী বলত? সে হয়তো এই ছোট কিউবিকলটা দেখে নাক সিঁটকাত। হয়তো বলত: “এই তোমার স্বপ্ন? এই ছোট্ট ডেস্ক, এই বোরিং মিটিং, এই একঘেয়ে রুটিন — এটাই তোমার মহান সংগ্রামের ফল?” আর আমি জবাব দিতাম, ক্লান্ত গলায়: “তুমি এখনো অনেক কিছু বোঝো না।” কিন্তু সত্যি কি সে বোঝে না? নাকি আমিই ভুলে গেছি কী চেয়েছিলাম? নাকি আমরা দুজনেই অন্ধ — সে ভবিষ্যতের প্রতি, আমি অতীতের প্রতি?

হ্যাপি মাঝে মাঝে বলে, রাতে শুতে যাওয়ার আগে, যখন ঘরে নীরবতা নেমে আসে: “তুমি অন্যরকম ছিলে।” আমি জিজ্ঞেস করি: “কেমন অন্যরকম?” সে একটু ভাবে, যেন সঠিক শব্দ খুঁজছে, তারপর বলে: “আত্মবিশ্বাসী। নিশ্চিত। তোমার কথায় একটা জোর ছিল, চোখে একটা আলো ছিল।” আমি হাসি — সেই হাসি যা হাসে তারা যারা জানে না হাসবে না কাঁদবে। কিন্তু মনে মনে প্রশ্ন জাগে: সেই আত্মবিশ্বাস কি আসলে অন্ধত্ব ছিল? নাকি এখনকার এই সন্দেহ, এই দোলাচল, এই অনিশ্চয়তাই ভুল? কোনটা সত্য — যৌবনের অহংকার নাকি মধ্যবয়সের অনুশোচনা?

যৌবনের অহংকার ছিল একটা শক্তি — অন্ধ শক্তি, কিন্তু শক্তি তো বটে। সেই শক্তি দিয়ে আমি পাহাড় ডিঙিয়েছি। বিয়ে করেছি এমন একজনকে যাকে ভালোবেসেছিলাম প্রথম দেখায়, যখন সবাই বলেছিল অপেক্ষা করো। চাকরি নিয়েছি এমন জায়গায় যেখানে কেউ সুযোগ দেখেনি, শুধু আমি দেখেছিলাম। সন্তানের জনক হয়েছি যখন মনে হয়েছে সময় হয়েছে, অন্যদের পরামর্শ উপেক্ষা করে। সেই অহংকার ছাড়া এসব কি সম্ভব হতো?

মধ্যবয়সের অনুশোচনাও একটা শক্তি — ভিন্ন ধরনের শক্তি। এই শক্তি দিয়ে আমি গভীরে যেতে পারি, পৃষ্ঠের নিচে দেখতে পারি। অন্যদের কষ্ট বুঝতে পারি কারণ নিজে কষ্ট পেয়েছি। ভুল স্বীকার করতে পারি কারণ জানি ভুল করা মানুষের স্বভাব। ক্ষমা করতে পারি কারণ নিজেও ক্ষমা চেয়েছি। তাহলে কোনটা ভালো? তীক্ষ্ণ তলোয়ার নাকি নমনীয় জল? আগুন নাকি ছাই?

আরাশের দিকে তাকিয়ে মনে হয় আমার একটা দায় আছে। তাকে সাবধান করে দেওয়ার দায়। বলার দায় যে জীবন তার ধারণার চেয়ে জটিল, স্বপ্ন সবসময় সত্য হয় না, আপস করতে হয় — কখনো ছোট, কখনো বড়। কিন্তু আমি জানি সে শুনবে না। যেমন আমি শুনিনি বাবার কথা। কারণ কিছু শিক্ষা হস্তান্তরযোগ্য নয়। কিছু ক্ষত নিজে পেতে হয়। কিছু সত্য নিজে আবিষ্কার করতে হয়।

হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম। প্রতিটা প্রজন্ম নিজের অহংকার নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। নিজের ভুল করবে। নিজের দেয়ালে ধাক্কা খাবে। আর তারপর একদিন, কোনো এক সন্ধ্যায়, আয়নায় দেখবে সেই দ্বিতীয় মুখটা — ক্লান্ত, প্রশ্নবিদ্ধ, কিন্তু হয়তো আগের চেয়ে একটু বেশি জ্ঞানী।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়াই শেষবার। আজ আর দুটি মুখ দেখি না। দেখি একটাই মুখ — যেখানে পঁচিশ আর সাঁইত্রিশ মিশে গেছে একটা অদ্ভুত মিশ্রণে। সেই মুখে যৌবনের অহংকারের ছায়া এখনো আছে — কিছু স্বপ্ন এখনো মরেনি। আবার মধ্যবয়সের অনুশোচনার দাগও আছে — কিছু ক্ষত এখনো শুকায়নি। এই দুইয়ের সহাবস্থান, এই দুইয়ের টানাপড়েন, এই দুইয়ের সংলাপ — এটাই হয়তো আমার আসল পরিচয়। আমি শুধু পঁচিশের সেই দাম্ভিক তরুণ নই। আমি শুধু সাঁইত্রিশের এই ক্লান্ত প্রৌঢ়ও নই। আমি এই দুইয়ের যোগফল — এবং যোগফল সবসময় অংশগুলোর চেয়ে বড়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *