“সবাই একসাথে ছবি তুলি।” হ্যাপির এই প্রস্তাবে সবাই রাজি। কিন্তু যেই না ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম, অমনি শুরু হল এক অদ্ভুত যন্ত্রণা। “স্মাইল করুন” – এই একটা কথায় আমার মুখে যে কৃত্রিম হাসি ফোটে, সেটা দেখলে আমি নিজেই হাসি পাই।
আরাশ তার ফোনে ক্যামেরা ওপেন করেছে। “আব্বু, আম্মু, আসেন। এখানে দাঁড়ান।” আমরা পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়েছি। হ্যাপি আমার বাম পাশে, আমি মাঝখানে, আরাশ ডান পাশে। একটা পারফেক্ট ফ্যামিলি ফটোর জন্য।
“রেডি? থ্রি, টু, ওয়ান…” আরাশ ক্যামেরা উঁচু করল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মুখে যে হাসি এল, সেটা আমার স্বাভাবিক হাসি নয়। এটা একটা “ছবির জন্য হাসি”। চোখ কুঁচকানো, দাঁত বের করা, গাল ফুলানো – সব কিছু অস্বাভাবিক।
প্রথম ছবি তোলার পর আরাশ দেখল। “আব্বু, আপনার হাসি তো একদম জোর করে লাগছে।” আমি বললাম, “তাহলে আরেকটা তোল।” কিন্তু জানি যে পরের ছবিতেও একই অবস্থা হবে।
কেন এমন হয় আমাদের সাথে? স্বাভাবিক সময়ে আমরা যে হাসি হাসি, ক্যামেরার সামনে সেটা কেন আর থাকে না? যেন “স্মাইল” শব্দটাই আমাদের মুখের পেশিকে জমিয়ে দেয়।
হ্যাপি বলল, “চল আরেকবার তুলি। এবার প্রাকৃতিকভাবে হাসি।” “প্রাকৃতিকভাবে হাসি” – এই কথাটাই কত অদ্ভুত। হাসি তো প্রাকৃতিক হতে হয়। জোর করে প্রাকৃতিক হাসি আসে কি?
দ্বিতীয়বার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম। এবার ভাবলাম কিছু মজার কথা ভাবব। তাহলে হয়তো স্বাভাবিক হাসি আসবে। কিন্তু সেই চাপের মধ্যে কোনো মজার কথা মনে এল না।
আরাশ আবার বলল, “থ্রি, টু, ওয়ান…” আর আমার মুখে আবার সেই একই কৃত্রিম হাসি। যেন আমার মুখে একটা স্প্রিং লাগানো আছে যেটা “স্মাইল” শুনলেই চালু হয়ে যায়।
ছোটবেলায় স্কুলের ফটো তোলার সময়ও এমন হত। ফটোগ্রাফার বলত, “চিজ বলো।” আমরা সবাই “চিজ” বলতাম। কিন্তু সেই হাসি দেখতে লাগত যেন আমরা কান্না করছি।
পরিবারের পুরনো ছবিগুলো দেখলে হাসি পায়। সবার মুখে একই ধরনের জোরদস্তি হাসি। মা-বাবা, ভাই-বোন – সবাই দেখতে লাগে যেন কেউ তাদের জোর করে হাসতে বলেছে।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন ক্যামেরার সামনে আমরা অস্বাভাবিক হয়ে যাই? কেন স্বাভাবিক থাকতে পারি না?” মনে হয় উত্তর আসছে – “ছবি স্থায়ী, তাই নিখুঁত হতে চাও।”
সত্যিই তো। ছবি থেকে যাবে। ভবিষ্যতে দেখা হবে। তাই সেটা যেন সুন্দর হয়, সেই চিন্তায় আমরা নিজেদের অস্বাভাবিক করে তুলি।
তৃতীয়বার ছবি তোলার সময় ভাবলাম, “যা হয় হোক। স্বাভাবিক থাকব।” কিন্তু “স্বাভাবিক থাকব” এই চিন্তাটাই অস্বাভাবিক। কে স্বাভাবিক থাকার জন্য চিন্তা করে?
আরাশ বলল, “এবার কেউ পোজ দেবেন না। সবাই যেমন আছেন তেমনি থাকেন।” কিন্তু “পোজ দেব না” এটাও তো একধরনের পোজ।
অবশেষে কয়েকটা ছবি তোলা হল। পরে সেগুলো দেখলাম। সবগুলোতেই আমাদের হাসি দেখতে যান্ত্রিক। কিন্তু তবুও এগুলোই আমাদের পারিবারিক স্মৃতি হয়ে থাকবে।
আরাশ বলল, “আমরা কেন ভিডিও করি না? ছবির চেয়ে ভিডিওতে স্বাভাবিক লাগি।” সত্যি কথা। ভিডিওতে আমরা আরো প্রাণবন্ত থাকি। কারণ তখন একটা মুহূর্ত ধরে রাখার চাপ নেই।
হয়তো এটাই ছবি তোলার সমস্যা। এটা একটা মুহূর্তকে চিরকালের জন্য আটকে রাখে। আর আমরা চাই সেই মুহূর্তটা নিখুঁত হোক। এই চাহিদাই আমাদের অস্বাভাবিক করে তোলে।
পরের বার ছবি তোলার সময় চেষ্টা করব আরো স্বাভাবিক থাকতে। কিন্তু জানি যে এই “স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা”ও আমাকে অস্বাভাবিক করে তুলবে। এটাই হয়তো পারিবারিক ছবির চিরন্তন বিড়ম্বনা।
একটু ভাবনা রেখে যান